জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজ থেকে স্টারগেজিং

দূরবিনের যাত্রা শুধু তারার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হওয়ার জন্য নয়, বরং এটি মানুষের ভেতরের সম্ভাবনার আলো খুঁজে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। ঠিক তেমনই একটি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দূরবিনের পাঁচ জন ভলান্টিয়ার পৌঁছায় জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর।

কলেজের গেইট পেরিয়ে যখন তারা ক্যাম্পাসে ঢোকে, চোখে পড়ে ক্যাডেট কলেজের ভিন্ন মনোরম পরিবেশ। সুশৃঙ্খলতা, সময়সূচি এবং বিকালের সেশনে মনোযোগী শিক্ষার্থীরা আগমনের মুহূর্ত থেকেই অনুভব করিয়ে দেয়, দিনটি হতে চলেছে বিশেষ! প্রথম দিনের বিকালের সেশনে ক্যাডেট কলেজ কর্তৃপক্ষ ভলান্টিয়ারদেরকে সব ছাত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারপর তারা ক্যাডেটদের সামনে দূরবিনের পরিচয় উপস্থাপন করে এবং দূরবিনের ৩টি টেলিস্কোপ ও একটি বাইনোকুলার প্রদর্শন করে। দ্বিতীয় দিনও বিকালবেলায় ক্যাডেটদের সাথে দূরবিনের কোর ভলান্টিয়াররা একটি সেশন নেয় যেটাতে মূলত টেলিস্কোপ নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বিকালের সেশন শেষে ছিল জন্য একটা ছোট্ট চায়ের বিরতি। তারপরই শুরু হলো রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ। তিন শতাধিক শিক্ষার্থী হলেও তারা ছোট ছোট দলে দুরবিনের কাছে আসে। সেই দলবদ্ধ আগমন পুরো পর্যবেক্ষণ পর্বটাকে মসৃণ করে তুলেছিল।

টেলিস্কোপ দিয়ে প্রথমবার গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি কোন টেলিস্কোপ কীভাবে কাজ করে এসব নিয়েও ক্যাডেটদের মাঝে বেশ কৌতূহল দেখা গিয়েছিল। টেলিস্কোপের পাশাপাশি স্টেলারিয়াম অ্যাপ ব্যবহার করে শনি ও তার বলয় দেখা, খালি চোখে ক্যাসিওপিয়া প্লিয়াডিস ইত্যাদি কনস্টেলেশন আকাশে খুঁজে বের করা, ইউনিস্টেলার ইকুইনক্স দিয়ে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করা এরকম প্রতিটি মুহূর্তে ছাত্রীদের বিস্ময় যেন সে রাতের আকাশকে আরও আলোকিত করে তুলেছিল। তবে সে রাতে আকাশে চাঁদ দেখা যায়নি।

দূরবিন দিয়ে দূর বিশ্বের নাগরিকদের সাথে দূর আকাশ দেখার সাথে সাথে ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীদের কৌতূহলী মনে জাগে নানান রকমের প্রশ্ন। মোট শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ৩০০, তবুও তাদের প্রশ্ন করার মাঝে ছিল এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা! মহাবিশ্ব ও মহাকাশের নানা বস্তু আর বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করার পাশাপাশি আরও যেসব প্রায়োগিক প্রশ্ন সেদিন পাওয়া গিয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: অ্যাস্ট্রোনমিতে পড়ার ও ক্যারিয়ার গড়ার পথ কী? বাংলাদেশ থেকে কীভাবে অ্যাস্ট্রোনমি বা অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে গবেষণা শুরু করা যায়? অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে পড়লে ক্যারিয়ার কতটা নিশ্চিত? বিদেশে অ্যাস্ট্রোনমি বা অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে উচ্চশিক্ষার জন্য কীভাবে আগানো উচিত?

সব মিলিয়ে সে রাতে ছাত্রীদের চোখে দেখা গিয়েছিল একটা ঝিলিক, যা কেবল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা মানুষদের চোখেই থাকে। মেয়েরা এখন কেবল এসব কার্যক্রমে অংশগ্রহণই করছে না, তারা সায়েন্স টেকনোলজি ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যাথমেটিক্স, অর্থাৎ স্টেম-ভিত্তিক শিক্ষার জন্য সত্যিই আগ্রহী।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকরাও ছিলেন সমান কৌতূহলী। তারা আগ্রহ দেখালেন, জিজ্ঞাসা করলেন, এবং লক্ষ্য করলেন যে মেয়েদের স্টেমে অংশগ্রহণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এই চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা তাদের কলেজের ছাত্রীদের জন্য অ্যাস্ট্রোনমি, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে জানার ও শেখার সুযোগ করে দিতে তাদেরকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে বলে আশা করা যায়।

এস্ট্রোনমি ও এস্ট্রোফিজিক্স এবং সার্বিকভাবে স্টেমের বিষয়গুলো বহুদিন ধরে “ছেলেদের” বিষয় হিসেবে দেখা হতো। তবে বর্তমান যুগে এই ধারণা দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজে দূরবিনে সেশনটি সেই দীর্ঘকালীন পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়। শিক্ষকরাও ইতিমধ্যেই মেয়েদের স্টেমে অংশগ্রহণের প্রয়োজন বোঝেন, এবং এই আয়োজন দেখালো যে, স্টেম মেয়েদের জন্য স্বাভাবিক ও সহজলভ্য হয়ে উঠছে।

দুইদিনের ইভেন্টের ফাঁকে দূরবিনের ভলান্টিয়াররা স্থানীয় দুটি ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখে। একটি ছিল লকমা রাজবাড়ি আর আরেকটি ছিল পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার, আনুমানিক অষ্টম শতকে স্থাপিত একটি বৌদ্ধ বিহার যাকে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়। আকাশের গল্প জানার ও বলার পাশাপাশি মাটির গল্পও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, দূর বিশ্বের নাগরিকদের এই সফর তারই এক সুন্দর বার্তা।

এই যাত্রা আমাদেরকে জানায়, যদি সুযোগ আর যথাযথ উৎসাহের যোগান দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের মেয়েরাও উন্মোচন করতে পারে দূরের আকাশের অজানা রহস্য।

[শেখ সামিয়া আক্তার সামি’র প্রথম ড্রাফট থেকে এডিট করেছে দূরবিন ও জেমিনাই।]