Abekta

The Encyclopédie of CASSA

User Tools

Site Tools


bn:courses:ast100:5

৫. কেমিকেল যুগ

জুনো: আমাদের নৌকা এখন ব্রহ্মপুত্র থেকে যমুনায় যাচ্ছে, কেমিকেল যুগের কথা শুরু করার এখনি সময়, কারণ মথুরার কৃষ্ণ আর আগ্রার তাজমহলের কারণে ‘ইয়ামুনা’ (যদিও তা ভারতে একেবারে ভিন্ন নদী) শব্দটার সাথে প্রাণের গভীর রূপক সম্পর্ক আছে। তবে এই যুগ শুরু করতে হলে আমাদেরকে আগে পৃথিবীর ৪৫০ কোটি বছরের ইতিহাস একটু ঝালাই করে নিতে হবে, কারণ এর মধ্যে প্রথম ৪০০ কোটি বছরই হবে আমাদের পার্থিব কেমিকেল যুগ।

সক্রেটিস: তার মানে কেমিকেল যুগে আমরা শুধু পৃথিবীতে ফোকাস করব?

জুনো: শুধু একটা গ্রহের জটিল কেমিস্ট্রির ইতিহাসই যেহেতু আমরা জানি সেহেতু এই যুগে পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করাই যৌক্তিক হবে। কিন্তু আলোচনা শেষে আমরা সৌরজগতের ভিতরে বা বাইরে অন্য গ্রহে জটিল অণু ও প্রাণ খোঁজার উপায় নিয়েও কথা বলব। আসলে আমাদের প্ল্যান এখানে অনেকটা গ্রহ যুগের মতোই। গ্রহ যুগে হার্মিস মূলত সৌরজগতের উপর ফোকাস করেছিল, কিন্তু শেষে অন্যান্য তারার চারদিকে গ্রহ আবিষ্কার নিয়েও কথা বলেছে।

সক্রেটিস: ভালো প্ল্যান। তাহলে শুরু করো।

1. সমুদ্র ও বাতাস

জুনো: আনুমানিক ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর জন্ম। প্রথম ৫০ কোটি বছর পৃথিবীর পৃষ্ঠ অনেক গরম ও আগ্নেয়গিরিতে পরিপূর্ণ ছিল এবং নিজের অক্ষে সে অনেক জোরে ঘুরছিল, মাত্র ১২ ঘণ্টায় এক বার। তার উপর ভিতরের চারটা গ্রহ নির্মাণের পর বাকি থেকে যাওয়া অনেক পাথরের টুকরা ও ধূমকেতু মহাশূন্য থেকে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ছিল লেইট হেভি বম্বার্ডমেন্টের সময়। এই যুগের নাম হেডিয়ান এরা। এই যুগের কিছু অক্ষত জিরকন (ZrSiO$_4$) পাওয়া গেছে যা থেকে বুঝা যায় তখনি সমুদ্রের অস্তিত্ব ছিল।

সক্রেটিস: সমুদ্র কিভাবে তৈরি হয়েছে?

জুনো: আগ্নেয়গিরি এবং ক্রাস্টের সব ফাটল দিয়ে পৃথিবীর ভিতর থেকে জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে উঠেছে, এই প্রক্রিয়ার নাম আউটগ্যাসিং। পৃথিবী ঠাণ্ডা হওয়ার পর এসব বাষ্প থেকে মেঘ এবং মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়েছে। সমুদ্রের একটা কারণ এই বৃষ্টি। তবে সমুদ্রের পানির একটা বড় অংশ বম্বার্ডমেন্টের সময় গ্রহাণু ও ধূমকেতুর মাধ্যমেও সম্ভবত এসেছে। তখন সম্ভবত পুরো পৃথিবীই সমুদ্রে ঘেরা ছিল, কোনো বড় মহাদেশ ছিল না। সমুদ্র জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আগ্নেয় দ্বীপ, মানে বিভিন্ন আগ্নেয়গিরির চূড়া। বাষ্প ও পানিতে অক্সিজেন ছিল, জিরকনে অক্সিজেন ছিল, কিন্তু মুক্ত আণবিক অক্সিজেন (O$_2$) তখন বায়ুমণ্ডলে একদমই ছিল না।

সক্রেটিস: বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের বৃদ্ধিই কি এই ফিগারে দেখাচ্ছ?

জুনো: শুধু বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াই দেখাচ্ছি না, সাথে সমুদ্রের কেমিকেল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও দেখানো হয়েছে। হেডিয়ানের পর আর্কিয়ান যুগ শুরু হয় ৪০০ কোটি বছর আগে থেকে। তবে পৃথিবীর ক্রাস্ট মোটামুটি স্থির হতে শুরু করে ৩৮০ কোটি বছর আগে, তখনই বর্তমান মহাদেশগুলোর পূর্বসূরি বিভিন্ন মাইক্রো-কন্টিনেন্টের জন্ম শুরু। ফিগারে দেখতে পাচ্ছ, ৩৫০ কোটি বছর আগে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। এ সময় মাইক্রোবায়াল ম্যাট ছিল, মানে সমুদ্রের পানির পৃষ্ঠে স্তরে স্তরে সাজানো সায়ানোব্যাক্টেরিয়ার কলোনি। সবার উপরের স্তরের সায়ানোব্যাক্টেরিয়া সূর্যের আলো, কার্বন ডাই অক্সাইড ও পানি মিশিয়ে অক্সিজেন তৈরি শুরু করে দিয়েছিল তখনি, যে-প্রসেসের নাম ফটোসিন্থেসিস। এসব ম্যাট সময়ের সাথে পুরু হতে হতে এক সময় পাথরে পরিণত হয়েছে, যেসব পাথরের নাম স্ট্রোমাটোলাইট। স্ট্রোমাটোলাইট বিশ্লেষণ করেই আমরা জানতে পেরেছি মুক্ত অক্সিজেন কত আগে তৈরি হতে শুরু করেছিল।

সক্রেটিস: ফিগারের এক্স এক্সিসে সময়, কিন্তু ওয়াই এক্সিসে তো ঠিক অক্সিজেনের পরিমাণ দেখা যাচ্ছে না, দেখা যাচ্ছে বায়ুমণ্ডলীয় চাপে অক্সিজেনের অবদানের পরিমাণ, ১ মানে ১০০% আর ০.১ মানে ১০%, ০.০১ মানে ১%। এটা কি সরাসরি অক্সিজেনের পরিমাণই বুঝাচ্ছে?

জুনো: হ্যাঁ, ধরে নিতে পারো। বর্তমানে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় ২১% এবং এটা শূন্য থেকে বাড়া শুরু করেছে ৩২০ কোটি বছর আগে থেকে, যেখান থেকে ড্যাশ-লাইনটা শুরু। প্রথম দিককার ফটোসিন্থেসিস অক্সিজেনিক ছিল না, মানে তাতে অক্সিজেন তৈরি হচ্ছিল না। এ সময়কার ব্যাক্টেরিয়া লোহার সাথে অক্সিজেন ও পানি মিশিয়ে সমুদ্রের তলায় আয়রন কম্পাউন্ড তৈরি করেছিল। অক্সিজেনিক ফটোসিন্থেসিস ভালোভাবে শুরু হয় ৩০০ কোটি বছর আগে থেকে। এই একই সময় মাইক্রো-কন্টিনেন্ট জোড়া লেগে বিভিন্ন মহাদেশ রূপ নিতে শুরু করে। নতুন তৈরি অক্সিজেন সমুদ্রতলের আয়রনের সাথে বিক্রিয়া করে পুরো সমুদ্র আয়রনে ভরে দিয়েছিল। ফিগারে ‘আয়রন ওশান’ বলতে এটাই বুঝানো হয়েছে।

সক্রেটিস: ফিগার দেখে মনে হচ্ছে, মুক্ত অক্সিজেন তৈরি হতে শুরু করার অনেক পরে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়া শুরু করেছে। পরিবেশে অক্সিজেন উৎপাদন শুরু ৩১০ কোটি বছর আগে, কিন্তু গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট হয়েছে ২১০ কোটি বছর আগে, মাঝখানে প্রায় ১০০ কোটি বছর কি বাতাসে অক্সিজেন বাড়তে পারেনি সমুদ্রে আয়রনের জন্যই?

জুনো: হ্যাঁ, আয়রন একটা কারণ। আরেকটা কারণ হতে পারে সমুদ্রে এমন অনেক মাইক্রোব যারা অক্সিজেন দিয়ে মেটাবলিজম করত, মানে জীবন ধারণ করত। সমুদ্রে অক্সিডাইজ করার যোগ্য আয়রনের পরিমাণ কমে আসার পরই সায়ানোব্যাক্টেরিয়ার বানানো অক্সিজেন সব বাতাসে মিশতে শুরু করে এবং খুব কম সময়ের মধ্যে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বেড়ে প্রায় ১% হয়ে যায়। এই অক্সিজেনের কারণে তখন সালফার অক্সিডাইজড হয়ে সমুদ্রে মিশতে শুরু করে এবং আমরা পাই ‘সালফাইড ওশান’। তারপর অক্সিজেনের পরিমাণ কিভাবে ১ থেকে ২০ পার্সেন্ট হয়েছে সেটা জৈব যুগের আলোচনার বিষয়, এখন না।

সক্রেটিস: তাহলে এখন কেমিকেল যুগের গোড়ায় ফিরে যাও। তুমি জিরকোনিয়াম, সিলিকন, অক্সিজেন, আয়রন, সালফার, কার্বন ইত্যাদি অনেক মৌলের কথা বললে। কিন্তু আমরা জানি বিগব্যাঙের পরে মহাবিশ্বে মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম তৈরি হয়েছিল। বাকি সব রাসায়নিক মৌল কোত্থেকে আসলো?

2. পিরিয়ডিক টেবিল

জুনো: কোত্থেকে আসল বুঝার আগে পিরিয়ডিক টেবিল একবার দেখে নেয়া দরকার। বাম দিকে যে পার দেখছ তা আসলে শাখাহাতি চর, যমুনার মাঝখানে। ঐ ঘাটে নৌকা ভিড়ালে আমরা একটা দারুণ সাত তলা বিল্ডিং দেখতে পাব যা বানানো হয়েছে পিরিয়ডিক টেবিলের মতো করে।

সক্রেটিস: চলো তাহলে।

জুনো: এখন তো দেখতেই পাচ্ছ সবাই, ৭-তলা বিল্ডিংটা যমুনার দিকে মুখ করা, আর প্রত্যেক ফ্লোরে ১৮টা করে রুম। সবচেয়ে উপরের তলার নাম্বার ১, আর সবার নিচেরটার ৭। নিচের দুই তলার তিন নাম্বার রুম থেকে একটা দোতলা পিয়ার চলে এসেছে নদীর দিকে। এই পিয়ারেই নৌকা ভিড়ানো যায়।

[নৌকা ভিড়ে। সক্রেটিস সহ আট জন বিল্ডিংটার তারিফ করে নৌকায় বসেই।]

ইশ্তার: তাহলে বিল্ডিং দেখে-দেখেই আমাদেরকে পিরিয়ডিক টেবিলের বিউটি বুঝাও।

জুনো: একেক তলা পিরিয়ডিক টেবিলের একেক পিরিয়ড (রো), আর একেক রুম একেক গ্রুপ (কলাম)। পিরিয়ড ৭টা হলে গ্রুপ ১৮টা। কলামগুলোকে আবার চার ব্লকে ভাগ করা যায়: এস পি ডি এফ। প্রথম দুই কলাম নিয়ে হয় এস-ব্লক। এই ব্লকে হাইড্রোজেন ননমেটাল, এছাড়া প্রথম কলামের সবাই এল্কালি মেটাল (লাল), আর দ্বিতীয় কলামের সবাই এল্কালাইন আর্থ মেটাল (বেগুনি)। শেষ কলামের হিলিয়ামকেও এস-ব্লকে ফেলা হয়। হিলিয়াম ছাড়া ১৩ থেকে ১৮ নাম্বার কলামের সবাই পি ব্লকে। এদের মধ্যে আছে মেটালয়েড, পোস্ট-ট্রানজিশন মেটাল (সবুজ), হ্যালোজেন, ননমেটাল (হলুদ) আর নোবল গ্যাস (ব্রাউন)। এখানের কয়েকটা ননমেটাল প্রাণের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে কার্বন (C), নাইট্রোজেন (N), অক্সিজেন (O), ফসফরস (P) ও সালফার (S), সংক্ষেপে সিনপ্স। কলাম ৩ থেকে ১২ পর্যন্ত ডি ব্লক, এখানের সবাই ট্রানজিশন মেটাল (নীল)। আর আমরা যে পিয়ারে ভিড়েছি এখানের সব মৌল এফ ব্লকে (সায়ান রং), নিচের তলায় এক্টিনাইড (Ac দিয়ে শুরু), তার উপরের তলায় ল্যান্থানাইড (La দিয়ে শুরু); এদের মধ্যে অনেকেই রেডিওএক্টিভ।

সক্রেটিস: রুম ঠিক ১১৮টা কেন?

জুনো: কারণ এখন পর্যন্ত মোট ১১৮টা মৌলিক এটমের কথা জানা গেছে। হাইড্রোজেনের এটমিক নাম্বার ১, ওগানেসনের ১১৮। এটমের কেন্দ্রে নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে, আর চারদিকে থাকে ইলেক্ট্রন। নিউক্লিয়াসে যে-কয়টা প্রোটন থাকে তাই এটমিক নাম্বার। প্রোটনের সমান পরিমাণ ইলেক্ট্রন থাকলে এটমটা হয় নিউট্রাল, ইলেক্ট্রন প্রোটনের চেয়ে বেশি বা কম হলে পাওয়া যায় আয়ন, বেশি হলে নেগেটিভ আয়ন (যেহেতু ইলেক্ট্রন নেগেটিভ), আর কম হলে পজিটিভ আয়ন। তবে একটা এটমের ধর্ম নির্ধারিত হয় প্রোটনের সংখ্যা দিয়ে।

সক্রেটিস: পরমাণুর ধর্ম বলতে কি বুঝাচ্ছ?

জুনো: উদাহরণ দিলে বুঝবে। যেমন স্বর্ণের (Au, লাতিন Aurum থেকে) মধ্যে ৭৯টা প্রোটন, এবং গোল্ড এমন সলিড যে ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও কঠিন থাকে, গলাতে হলে লাগে ১০৬৪° সেলসিয়াস। কিন্তু এর সাথে মাত্র একটা প্রোটন যোগ করলেই আমরা পাই পারদ (Hg, মার্কারি) যা −৪০° সেলসিয়াসেই গলে তরল হয়ে যায়, যেকারণে রুম টেম্পারেচারে থার্মোমিটারের ভিতরে পারদ তরল থাকে। তার মানে মাত্র একটা প্রোটন এটমের ধর্ম এতটা পাল্টে দিতে পারে।

সক্রেটিস: বুঝলাম। তো ১১৫ নাম্বারে যে মস্কোভিয়াম দেখছি তা কি শুধু মস্কোতে পাওয়া যায়?

জুনো: বিরক্তিকর কমেডি তোমার কমানো উচিত, সক্রেটিস।

সক্রেটিস: জাজমেন্ট রেখে উত্তর দাও।

জুনো: ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াসে ৯২টা প্রোটন, এর চেয়ে ভারী প্লুটোনিয়ামে ৯৪টা। এর চেয়ে বেশি প্রোটন যাদের তাদেরকে প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না, সেগুলো বিজ্ঞানীরা ল্যাবে কৃত্রিমভাবে সিন্থেসাইজ করেছেন। মস্কোভিয়াম বানানোর পিছনে মস্কোর বিজ্ঞানীদের অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল, তাই এমন নাম।

সক্রেটিস: প্লুটোনিয়ামের চেয়ে ভারী কোনো মৌল নেচারে নাই কেন?

জুনো: তা বুঝতে হলে আমাদেরকে কণা যুগের কথায় ফিরে যেতে হবে। আমরা রবির কাছ থেকে শুনেছিলাম, একই চার্জের দুইটা কণাকে অনেক কাছে নিয়ে আসলে তাদের ইলেক্ট্রোম্যাগ্নেটিক বিকর্ষণের চেয়ে প্রভাবশালী হয়ে যায় স্ট্রং ফোর্সের আকর্ষণ। এই কারণেই নিউক্লিয়াসে পজিটিভ চার্জের এত প্রোটন একসাথে থাকতে পারে। কিন্তু ৯৪টার বেশি প্রোটন থাকলে নিউক্লিয়াস আর স্টেবল থাকতে পারে না। এজন্যই নেচারে নাই, ল্যাবে বানাতে হয়।

সক্রেটিস: ল্যাবে নাহয় বানালাম, কিন্তু নেচারে স্বাভাবিকভাবে এত মৌলের জন্ম হলো কিভাবে। কণা যুগে তো আমরা দেখেছিলাম বিগব্যাঙের পর মহাবিশ্বে প্রধানত হাইড্রোজেন (৭৬ শতাংশ) আর হিলিয়াম (২৪ শতাংশ) তৈরি হয়েছিল। বাকি সব মৌল কোত্থেকে আসল?

জুনো: সেটাই এই ডায়াগ্রামে দেখানো হয়েছে, সূর্যের চেয়ে ৫০০ গুণ বড় একটা তারার মাধ্যমে। হিলিয়ামের চেয়ে ভারী কিছু মৌল বিগব্যাঙের পর-পর সামান্য পরিমাণে তৈরি হলেও পর্যায় সারণীর প্রায় সব মৌলের জন্ম হয়েছে তারার ভিতরে। প্রথম প্রজন্মের তারাদের ভর সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি ছিল, যেকারণে তারা অনেক ভারী মৌল বানাতে পেরেছে। কিভাবে তা তারা যুগে আমরা শুনেছি।

সক্রেটিস: আসলে শুনিনি। মার্স বলেছিল যে বড় তারাদের কোরে আয়রন পর্যন্ত মৌলের জন্ম হয়, কিন্তু কিভাবে তা সে ভালোভাবে বলেনি।

জুনো: তাহলে উপরের ডায়াগ্রামটা আবার দেখো। দেখবে জীবনের শেষ পর্যায়ে একটা বড় তারার কোর পেঁয়াজের মতো দেখায়, মানে তার অনেক লেয়ার থাকে। একদম কোরে আয়রন, তার বাইরে কয়েকটা শেল, প্রথম শেলে সিলিকন, তারপর যথাক্রমে ম্যাগ্নেসিয়াম, নিয়ন, অক্সিজেন, কার্বন, হিলিয়াম ও হাইড্রোজেনের শেল। তারাটা সারা জীবন ধরে এইসব মৌলের শেল বানিয়েছে। কিভাবে আবার শুনি আমরা। তারার কোরে সব হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হওয়ার পর নিউক্লিয়ার ফিউশন থেমে যায়, বহির্মুখী প্রেশার না থাকায় গ্র্যাভিটি তারাকে সংকুচিত ও উত্তপ্ত করে। এতে এক সময় কোরের কেন্দ্রের দিকের হিলিয়াম থেকে কার্বন তৈরি হয়, এবং তার বাইরে হিলিয়ামের একটা শেল থেকে যায়। কোরের সব হিলিয়াম কার্বন হয়ে গেলে ফিউশন আবার বন্ধ হয়, এবং আগের মতোই তারাটা সংকুচিত ও উত্তপ্ত হয়। এর ফলে কোরের কার্বন থেকে হয় অক্সিজেন, তার বাইরে কার্বনের একটা শেল থেকে যায়, এবং তার বাইরে থাকে আগের হিলিয়াম শেল। এইভাবে ফিউশন ও গ্র্যাভিটেশনের পারস্পরিক প্রভাবে একের পর এক লেয়ারের জন্ম হয়। সবচেয়ে ভারী মৌল থাকে কেন্দ্রে, যত বাইরে যাই তত হালকা মৌল পাওয়া যায়।

সক্রেটিস: ডায়াগ্রামের ডানে কি কোন বিক্রিয়া হতে কতদিন লাগে দেখাচ্ছ?

জুনো: কোন বিক্রিয়া তারার গর্ভে কতদিন ধরে চলে সেটা দেখানো হয়েছে, সেই সাথে প্রত্যেক ফিউশন বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রাও দেখানো হয়েছে মেগাকেলভিন ও গিগাকেলভিন ইউনিটে। ৫ মেগাকেলভিনে হওয়া হাইড্রোজেন ফিউশন চলে ৭ মিলিয়ন বছরে ধরে। আর ২.৫ গিগাকেলভিনে হওয়া সিলিকন ফিউশন ঘটে মাত্র ১ দিনের মধ্যে। তার মানে একটা ভারী তারার আয়রন কোর মাত্র এক দিনে তৈরি হয়, এই দিনকে বলা যায় তার জীবনের শেষ দিন।

সক্রেটিস: আয়রনে প্রোটন মাত্র ২৬টা। তাহলে ২৭ প্রোটনের কোবাল্ট থেকে শুরু করে ৯৪ প্রোটনের প্লুটোনিয়াম পর্যন্ত সব মৌল কোত্থেকে আসল? তারা তো বললে জীবনের শেষ দিনে পৌঁছে গেছে।

জুনো: তারা যুগে আমরা শুনেছি মৃত্যুর সময় এই ধরনের ভারী তারা বিস্ফোরিত হয় সুপারনোভা হিসেবে। মৃত্যুর সময় এক বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে তারা আমাদেরকে বাকি সব মৌল দিয়ে যায় উপহার হিসেবে। মহাবিশ্বের প্রতি এটা তারার শেষ দান। কিভাবে বলছি। আয়রনের চেয়ে ভারী মৌল সাধারণ ফিউশনের মাধ্যমে হতে পারে না, কারণ সেসব মৌল বানাতে যত শক্তি বিনিয়োগ করতে হয় তার চেয়ে কম শক্তি ফেরত পাওয়া যায় বানানোর পর। এই ধরনের লোকসানি বিক্রিয়া প্রকৃতি ঘটতে দেয় না। কিন্তু সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় হঠাৎ তারার মধ্যে এত বিপুল পরিমাণ শক্তি বিমুক্ত হয় যে আরো ভারী মৌল বানানোর বিক্রিয়ায় শক্তি বিনিয়োগ করা যায়। বিস্ফোরণের মুহূর্তে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে আয়রনের চেয়ে ভারী অনেক মৌলের জন্ম হয়। তবে সুপারনোভা ছাড়াও আরো কিছু স্লো প্রসেস আছে যার মাধ্যমে ভারী মৌল বানানো যায়। অত ডিটেলে আমরা যাব না।

3. পৃথিবীতে প্রাণ

সক্রেটিস: চমৎকার। এখন এই পিরিয়ডিক টেবিলের ডকে নৌকা ভিড়ানো থাকা অবস্থাতেই মনে হয় তোমার বলা উচিত পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম কিভাবে হয়েছে। সমুদ্রের জন্মের কথা আগেই শুনেছি। ধরে নিলাম ৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে সমুদ্রও ছিল। কিন্তু তারাদের গর্ভ থেকে সব মৌল সেই সমুদ্রের ভিতরে কোত্থেকে এসেছিল?

জুনো: তা তো বুঝতেই পারছ। বিস্ফোরণের পর একটা তারা তার ভিতরের সব মৌল ইন্টারস্টেলার মিডিয়ামে ছড়িয়ে দেয়। আমাদের সোলার সিস্টেম যেই ইন্টারস্টেলার ক্লাউড থেকে জন্মেছে সেই মেঘের ভিতরে অনেক মৌল আগেই ছিল আশপাশের অনেক তারার বিস্ফোরণ ও মৃত্যুর কারণে। একটা মেটাল-রিচ মেঘ থেকেই যেহেতু পৃথিবীর জন্ম, সেহেতু সে শুরু থেকেই সব মৌল পেয়েছিল বলা যায় উত্তরাধিকার সূত্রে।

সক্রেটিস: বেশ। তাহলে বলো এসব জড় মৌল থেকে কিভাবে আমরা পেলাম বায়োমলিকুল, জৈবাণু।

জুনো: পুরো প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না। তবে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং অনুমানটা উপরের ডায়াগ্রামে দেখানো হয়েছে। একদম বাম দিকে সমুদ্রের তলদেশে একটা হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট দেখানো হয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সমুদ্রগর্ভের এরকম গর্তেই প্রথম প্রাণের জন্ম প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে। তখন সমুদ্র ছিল এসিডিক, পিএইচ লেভেল ৬। আর ওশান ফ্লোরের ভেন্টের ভিতরে ছিল এল্কালাইন বা বেসিক তরল, পিএইচ লেভেল ১১। অম্লীয় সমুদ্রে ছিল পজিটিভ হাইড্রোজেন আয়ন (H$^+$), মানে প্রোটন। ক্ষারীয় ভেন্টে ছিল নেগেটিভ হাইড্রক্সিল আয়ন (OH$^-$)। সমুদ্র ও ভেন্টের মাঝখানে দেয়ালের মতো ছিল আয়রন-নিকেলের সালফাইড, Fe(Ni)S, যা দেয়ালের মধ্যে অনেক মাইক্রোস্কপিক রুম তৈরি করেছিল। এই সব রুমে সমুদ্রের জল থেকে নিচে আসা প্রোটনের প্রবাহে জড় হাইড্রোজেন ও কার্বন ডায়োক্সাইড থেকে তৈরি হয়েছিল জৈব আয়ন ফর্মেইট, যার ফর্মুলা HCOO$^-$। এভাবেই জড় থেকে জীব না হলেও অন্তত জৈবের জন্ম।

সক্রেটিস: শুধু ফর্মেইট বানালেই হবে? জীবন কি এত সহজ জিনিস?

জুনো: অবশ্যই না। ফর্মেইট একটা উদাহরণ মাত্র। ডায়াগ্রামে ভেন্টের ডান পাশে তীর চিহ্নের উপরে ও নিচে পরের বেশ কিছু ধাপ দেখানো হয়েছে। প্রাণের প্রথম প্রকাশ আসলে ঘটেছিল আদিম মেটাবলিজমের মাধ্যমে, উপরের বড় সাইকেলে যা দেখা যাচ্ছে।

সক্রেটিস: মিটবল শুনেছি, মেটাবল কি তাই জানি না, তার উপর আবার মেটাবল-ইজম!

জুনো: ইচ্ছা ছিল জিনিসটা কি বলব, তোমার বাজে সার্কাজম শুনে ইচ্ছা মরে গেছে। মেটাবলিজম কি জিনিস তোমার এআইকে জিজ্ঞাসা করো, আমাকে না। আমরা প্রোটো-মেটাবলিজমের ছবিতে ফিরি। কোষের মতো একটা কুয়া দেখতে পাচ্ছ, যার দেয়াল ভেদ করে ভিতরে আসতে পারে প্রোটন (H$^+$), কারণ দেয়ালের বাইরে সমুদ্র পজিটিভ আর দেয়ালের ভিতরটা নেগেটিভ। ব্যাটারির মতো প্রোটনের প্রবাহে এই কুয়ার ভিতরে সম্ভবত একটা আদিম ক্রেবস সাইকেল চলছিল, যে বায়োকেমিকেল সাইকেলের মাধ্যমে জীব পুষ্টি পায়, মানে নিউট্রিয়েন্ট থেকে এনার্জি জোগাড় করে। এখানে নিউট্রিয়েন্ট মানে ইনপুট হিসাবে কাজ করছিল প্রধানত হাইড্রোজেন, হাইড্রক্সিল, কার্বন ডায়োক্সাইড। আর আউটপুট ছিল প্রাণের জন্য সবচেয়ে দরকারি চার ধরনের বায়োমলিকুল: লিপিড, সুগার, এমিনো এসিড, নিউক্লিওটাইড। লিপিড দিয়ে জীব কোষের দেয়াল বানায়, সুগার থেকে শক্তি পায়, এমিনো এসিড দিয়ে প্রোটিন বানায়, আর নিউক্লিওটাইড দিয়ে আরএনএ ও ডিএনএ, মানে জেনেটিক কোড হয়।

সক্রেটিস: এই সব জিনিসের জন্মই কি তার পর দেখানো হচ্ছে?

জুনো: হ্যাঁ। প্রথমে সম্ভবত লিপিডের দেয়াল দিয়ে প্রোটোসেল তৈরি হয়েছিল, যারা ভেন্টের ভিতরে জিওকেমিকেল এনার্জির স্রোতে ভাসছিল। এই সেলের ভিতরে সবার আগে যেটা দরকার তা হলো একটা ইনফর্মেশন প্রসেসিং সিস্টেম, বা স্বয়ং ইনফর্মেশন। ইনফর্মেশন ছাড়া জীবের ফর্মেশন সম্ভব না, এক শরীর থেকে হাজার শরীর রেপ্লিকেট করা সম্ভব না। নিওক্লিওটাইড থেকে প্রথম ইনফর্মেশন সিস্টেম হিসেবে তৈরি হয় রাইবোনিউক্লিক এসিড (আরএনএ)। কপিপেস্টের কাজ প্রথম আরএনএ-ই শুরু করেছিল। তবে সিস্টেমটা আরো শক্তিশালী হয় যখন ডিওক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) উৎপাদন শুরু হয়। ইনফর্মেশন কোড করার কাজ ডিএনএ নিয়ে নেয়, আরএনএ পায় মেসেঞ্জারের কাজ। ডিএনএ’র কোড অনুসারে তৈরি হতে শুরু করে বিভিন্ন মলিকুলার মেশিন, রাইবোজোম ও প্রোটিন। এসব দিয়েই তৈরি হয় প্রথম লিভিং সেল। প্রথম কোষ মানুষের কোষের মতো ছিল না। আমাদের ইউক্যারিয়টিক কোষ মূলত গোল, আদিম প্রোক্যারিয়টিক কোষ ছিল লম্বা, এবং তাদের ভিতরে নিউক্লিয়াস ছিল না। সুতার মতো ডিএনএ (নীল রঙে দেখানো হয়েছে) কোষের তরলে ভাসত, আমাদের ক্রোমোজোমের মতো কেন্দ্রে পেঁচিয়ে থাকত না।

সক্রেটিস: এই জেনেটিক কোড জিনিসটা বুঝাও তো। প্রসেসর, কোড, ইনফর্মেশন, কপিপেস্ট, এই সব শব্দ তো কম্পিউটার কোডিঙের ক্ষেত্রে আমরা বুঝি। কম্পিউটারের সাথে জীবের কোষের কি সম্পর্ক?

জুনো: কোনো জিনিস বানানোর পারফেক্ট ইন্সট্রাকশন যদি একবার লিখতে পার কোড হিসেবে, তাহলে এই কোড দিয়ে জিনিসটা যত বার ইচ্ছা বানানো যাবে, যদি কাঁচামাল থাকে। এটা কেমিকেল ও বায়োলজিকেল স্কেলে পৃথিবী প্রথম বুঝতে পেরেছিল সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে। কম্পিউটার কোড যে-আলফাবেটে লেখা হয় তাতে লেটার মাত্র দুইটা, ০ আর ১। দুই বর্ণ দিয়েই বিভিন্ন দৈর্ঘের অসীম সংখ্যক ‘শব্দ’ বানানো সম্ভব। জীবের কোষে কোড লেখা হয় একটা ৪-বর্ণের আলফাবেট দিয়ে, বর্ণ চারটা হলো ইংলিশ এ টি সি জি।

সক্রেটিস: এটিসিজি আসলে ফিজিকেলি কি জিনিস?

জুনো: এ টি সি জি হলো চারটা নিউক্লিওটাইড বেইস যারা ডিএনএ’র দুইটা হেলিক্সের মধ্যে পরপর সাজানো ত্থাকে, নাইট্রোজেন দিয়ে তৈরি বলে এদেরকে নাইট্রোজেনাস বেইস বলে। ডায়াগ্রামে আমাদের শরীরের ডিএনএ দেখানো হয়েছে। একদম উপরে পেঁচানো হেলিক্স দুইটা দেখতে পাচ্ছ। এক হেলিক্সের বেইস আরেক হেলিক্সের বেইসের সাথে যুক্ত, দুই হেলিক্স থেকে আসা দুইটা বেইস নিয়ে হয় একটা বেইস-পেয়ার (বিপি)। অনেকটা স্পাইরাল সিঁড়ির মতো, সিঁড়ির দুই রেলিং যদি হয় দুইটা হেলিক্স, তাহলে ধাপগুলো হচ্ছে দুই হেলিক্সে লাগানো বেইস। বাম পাশে আরো পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছ, হেলিক্সের ফিতাটা তৈরি হয় ফসফেট ও সুগার দিয়ে, তার মধ্যে আটকানো থাকে বেইস। এ’র সাথে টি এবং সি’র সাথে জি’র বন্ধন দেখানো হয়েছে। এটিসিজি বেইসের স্ট্রাকচারও বামে নিচে দেয়া আছে, দেখতেই পাচ্ছ অনেক কার্বন নাইট্রোজেন অক্সিজেন হাইড্রোজেন। পরপর থাকা তিন জোড়া বেইস নিয়ে হয় একটা কোডন, বা ট্রিপ্লেট। যেসব কোডন একসাথে হয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রোটিন বানানোর কাজ করে, তাদেরকে একটা জিন বলা যায়। এখান থেকে জেনেটিক কোড ধারণাটা এসেছে।

সক্রেটিস: ডাবল হেলিক্সের নিচে আরো অনেক কিছু দেখতে পাচ্ছি, প্রত্যেকটার সাইজও লেখা আছে।

জুনো: হ্যাঁ, কোষের ভিতরে ডিএনএ’র প্যাকেজিং দেখানো হচ্ছে। ২ ন্যানোমিটার (ন্যামি) সাইজের ডিএনএ বেইস-পেয়ার (বিপি) হিস্টোন প্রোটিনের চারদিকে পেঁচানো থাকে। হিস্টোনে পেঁচানো ২০০ বিপি একসাথে মিলে হয় ১১ ন্যামি সাইজের নিউক্লিওজোম, যারা আবার পেঁচিয়ে আবার ৩০ ন্যামি সাইজের সলিনয়েড বানায়, যার প্রতি টার্নে ৬-৮ টা করে নিউক্লিওজোম থাকে। অনেক সলিনয়েড ফাইবার মিলে ৩০০-ন্যামি ক্রোমাটিন হয়, যারা জমে আরো পুরু ক্রোমাটিড বানায়, ৮৪০ ন্যামি ব্যাসের। মাঝখানে ব্রিজ দিয়ে যুক্ত দুইটা ক্রোমাটিড নিয়ে হয় একটা ক্রোমোজোম। এমন ৪৬টা ক্রোমোজোম আমাদের সেলের নিউক্লিয়াসের ভিতরে আছে।

সক্রেটিস: বিশাল প্যাঁচ।

জুনো: বাস্তবে প্যাঁচ আরো বেশি, আমি সোজা করে বললাম।

সক্রেটিস: এবার তাহলে প্যাঁচ খোলার জন্য এই প্রশ্নের উত্তর দাও: জিওকেমিকেল এনার্জির মাধ্যমে এইভাবে জড় থেকে জীবের জন্ম কি যেকোনো গ্রহে হতে পারে?

4. হ্যাবিটেবল জোন

মার্স: তার আগে আমাদের নৌকা ছাড়া উচিত। পিরিয়ডিক টেবিল যথেষ্ট দেখা হয়েছে। সামনেই তিস্তা নদী এসে মিলেছে যমুনায়।

[শাখাহাতি ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ে; আট জন তিস্তা-যমুনার কনফ্লুয়েন্সে আসে।]

সক্রেটিস: এই তিস্তা নদীতে বন্যার কারণেই শুনেছি ব্রহ্মপুত্র ময়মনসিংহ দিয়ে যাওয়া তার পুরাতন স্রোত থেকে এই যমুনায় এসে পড়েছিল? কেউ জানো নাকি?

রিয়া: হ্যাঁ, আমার জন্মের ঠিক ২০০ বছর আগে, ১৭৮৭ সালে, বড় ধরনের বন্যার কারণে তিস্তা নদী ব্রেক-ইন করেছিল ব্রহ্মপুত্রে, তখন থেকেই ময়মনসিংহের পথ ছেড়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ব্রহ্মপুত্রের এভালশন শুরু হয়। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সরতে সরতে অবশেষে ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোত হয় যমুনা, আগের স্রোতের নাম হয়ে যায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, যার পারে বানানো হয়েছে ময়মনসিংহ শহরের পার্ক, জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা।

জুনো: নৌকা থেকে তিস্তা-যমুনার কনফ্লুয়েন্সের বিশালতা দেখে আসলেই অনুভব করতে পারছি, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ডেল্টাকে কেন পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর জায়গা বলা যায়। অনেক হাজার বছর ধরে এই অঞ্চল ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতি এলাকাগুলোর একটি।

সক্রেটিস: তাহলে বলো, অন্য কোনো গ্রহে কি জীবের বসতি থাকতে পারে?

জুনো: সেটা বুঝতে হলে আগে হ্যাবিটেবল জোনের ধারণাটা বুঝতে হবে। গ্যালাক্সি তারা গ্রহ সব যেহেতু একই কেমিকেল এলিমেন্ট দিয়ে তৈরি, সেহেতু ধরে নেয়া যায় পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম যেভাবে হয়েছে অন্য অনেক গ্রহেও সেভাবে হতে পারে। পৃথিবীতে প্রাণের জন্য দরকার ছিল তরল পানির সমুদ্র। তাই কোনো গ্রহে যদি তরল পানির সমুদ্র থাকে তবে তা বাসযোগ্য বা হ্যাবিটেবল হতে পারে। উপরের ছবিতে দেখানো হয়েছে, একটা তারার চারদিকে যে অঞ্চলে গ্রহ থাকলে গ্রহের সার্ফেসে তরল পানির সমুদ্র থাকতে পারে সেই অঞ্চলকে বলে হ্যাবিটেবল জোন। এই জোনের বাইরে একটা গ্রহ যদি তারার আরো কাছে থাকে তাহলে এত গরম হবে যে পানি বাষ্প হয়ে যাবে, আর আরো দূরে থাকলে ঠাণ্ডায় পানি বরফ হয়ে যাবে। শুধু হ্যাবিটেবল জোনের ভিতরে থাকা গ্রহেই তাপমাত্রা ০ থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে এবং সার্ফেসে পানি তরল হিসেবে পাওয়া যায়। তবে প্রাণের জন্য ০ থেকে ৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত সবচেয়ে সুবিধাজনক।

সক্রেটিস: ডায়াগ্রামে এম কে জি এই তিন টাইপের তারার হ্যাবিটেবল জোন দেখছি। তারার তাপমাত্রা কমলে হ্যাবিটেবল জোন ছোট হচ্ছে কেন?

জুনো: শীতকালে বাড়ির উঠানে জ্বালানো আগুনের তেজ কম হলে যেমন আরামের জন্য আগুনের আরো কাছে যেতে হয়, তেমনি তারার তাপমাত্রা কম হলে তার আরো কাছে যেতে হবে গ্রহের তাপমাত্রা ০–৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখার জন্য। সূর্যের মতো জি টাইপ তারার ক্ষেত্রে হ্যাবিটেবল জোন সূর্য থেকে ০.৯–১.৬ এস্ট্রোনমিকেল ইউনিটের (এইউ) মধ্যে। ডায়াগ্রামে দেখা যাচ্ছে জি-টাইপের তুলনায় এম ও কে টাইপ তারার দুইটা অসুবিধা আছে: তাদের হ্যাবিটেবল জোন ছোট, এবং জোনটা তারার অনেক কাছে হওয়ায় সেখানে তারা থেকে বিকিরত এক্সরে’র পরিমাণ বেশি যা প্রাণের জন্য ক্ষতিকর। জি-টাইপের তুলনায় এম-টাইপ তারার হ্যাবিটেবল জোনে এক্সরে ৪০০ গুণ বেশি। তবে এম ও কে টাইপ তারার দুইটা সুবিধাও আছে: জি-টাইপের তুলনায় এদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং এরা অনেক বেশিদিন বাঁচে। অনেক দিন টিকে থাকায় ছোট তারার চারদিকে থাকা গ্রহে প্রাণ বিবর্তনের জন্য অনেক বেশি সময় পাবে।

সক্রেটিস: তার মানে কি মহাবিশ্বের বেশির ভাগ জৈব কালচার এক সময় এম ও কে-টাইপের মতো ছোট তারার চারদিকে পাওয়া যাবে?

জুনো: হতে পারে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, আমাদের মার্সও এক সময় হ্যাবিটেবল জোনের ভিতরে ছিল। মার্সের সার্ফেসে ২০০ কোটি বছর আগে তরল পানির নদী ও সমুদ্র ছিল, যার প্রমাণ তার সার্ফেসে এখনো আছে। তবে মঙ্গলে তখন প্রাণ ছিল কিনা জানা যায়নি।

সক্রেটিস: আর এক্সোপ্ল্যানেট? সূর্য ছাড়া অন্যান্য তারার হ্যাবিটেবল জোনে এখন পর্যন্ত কয়টা গ্রহ পাওয়া গেছে?

জুনো: এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত আনুমানিক ৬০০০ গ্রহের মধ্যে ৭০টা পাওয়া গেছে তাদের তারার হ্যাবিটেবল জোনের ভিতরে। এর মধ্যে পৃথিবীর সাথে মিল সবচেয়ে বেশি এমন ৪০টা গ্রহের নাম এই ফিগারে দেখা যাচ্ছে। এখানে এক্স অক্ষে আছে গ্রহের সার্ফেসে তারার আলোর তীব্রতা পৃথিবীর সাপেক্ষে, পার্সেন্টেজ হিসেবে। আলোর তীব্রতা তারা থেকে গ্রহের দূরত্বের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। ওয়াই অক্ষে আছে তারার তাপমাত্রা সূর্যের সাপেক্ষে।

সক্রেটিস: কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানল কিভাবে যে এরা আসলেই তাদের তারার হ্যাবিটেবল জোনে আছে?

জুনো: তারার উজ্জ্বলতা ও দূরত্ব থেকে তার তাপমাত্রা বের করা যায়, তাপমাত্রা জানলে হ্যাবিটেবল জোন বের করে ফেলা যায়। ট্রানজিট মেথড ইউজ করে গ্রহ আবিষ্কারের সময় তারা থেকে গ্রহের দূরত্বও জানা যায়, কারণ গ্রহের পিরিয়ড তার দূরত্বের উপর নির্ভর করে। এই দূরত্ব জানলেও বুঝা যাবে গ্রহটা হ্যাবিটেবল জোনে আছে কিনা।

সক্রেটিস: কিন্তু হ্যাবিটেবল জোনে থাকলেই যে গ্রহে লাইফ থাকবে তার কি গ্যারান্টি? আর থাকলেও সেই প্রাণ আবিষ্কারের উপায় কি?

5. প্রাণ খোঁজার উপায়

জুনো: গ্রহের প্রাণ খোঁজার জন্য আগে গ্রহের বায়ুমণ্ডল ডিটেক্ট করতে হবে। বায়ুমণ্ডলে বিশেষ কিছু অণু থাকলেই ধরে নেয়া যায় সেখানে প্রাণ আছে। এসব অণুকে বলে বায়োসিগ্নেচার। যেমন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে O$_2$ আর O$_3$ না থাকলে আমাদের মতো উন্নত জীব থাকতে পারত না। এই দুই অণু ছাড়াও পানি (বাষ্প হিসেবে), মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথাইল ক্লোরাইড, ইত্যাদিকে বায়োসিগ্নেচার হিসেবে ধরা হয়। এই ছয় বছর আগে, ২০১৯ সালে, হ্যাবিটেবল জোনে থাকা পৃথিবী-সদৃশ গ্রহ কে২-১৮ বি’র বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প পাওয়া গেছে।

সক্রেটিস: বায়ুমণ্ডলে বায়োসিগ্নেচার পাওয়া যায় কিভাবে?

জুনো: পাওয়া যায় স্পেক্ট্রস্কোপি’র মাধ্যমে, মানে তারার আলো বিভিন্ন রঙে বিশ্লেষণ করে দেখার মাধ্যমে। কোন রঙের (ওয়েভলেন্থ বা ফ্রিকোয়েন্সির) আলো কতটা আসছে তার চার্টকে বলা হয় স্পেক্ট্রাম বা বর্ণালি। এই ফিগারে তিন ধরনের স্পেক্ট্রাম বুঝানো হয়েছে: কন্টিনুয়াস, এমিশন ও এব্জর্পশন। একটা তারার আলো সরাসরি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় কন্টিনুয়াস স্পেক্ট্রাম, অবিচ্ছিন্ন বর্ণালি, কারণ তারা সব ওয়েভলেন্থের আলোই রেডিয়েট করে। অন্যদিকে, একটা গ্যাস ক্লাউড থেকে আলো আসে শুধু নির্দিষ্ট কিছু ওয়েভলেন্থে, রঙে, তাই তার স্পেক্ট্রাম হলো এমিশন স্পেক্ট্রাম। পার্থক্যটা বুঝতে হলে কণা যুগের কথা একটু স্মরণ করতে হবে। আলো তৈরি হয়ে ইলেক্ট্রনের এক্সিলারেশনের কারণে। তারার ভিতরে উচ্চ তাপমাত্রায় অসংখ্য ফ্রি ইলেক্ট্রন থাকে, যারা সম্ভাব্য সব এক্সিলারেশনে চলতে থাকে, তাই সব কম্পাঙ্কের আলোই পাওয়া যায়। কিন্তু গ্যাসমেঘে তাপমাত্রা কম হওয়ায় ফ্রি ইলেক্ট্রন থাকে না, তাই আলো পাওয়া যায় শুধু এটমের ভিতরে বাউন্ড ইলেক্ট্রনের বিভিন্ন ট্রানজিশনের মাধ্যমে, মানে এটমের এক এনার্জি লেভেল থেকে আরেক লেভেলে ইলেক্ট্রনের ট্রানজিশনের কারণে। প্রত্যেক ট্রানজিশনের জন্য একটা ইউনিক ওয়েভলেন্থের আলো উৎপন্ন হয়। আর ট্রানজিশন কেমন হবে তা নির্ভর করে মেঘে কি ধরনের অণু পরমাণু আছে তার উপর। তাই এমিশন স্পেক্ট্রাম থেকে গ্যাস ক্লাউডের কেমিকেল কম্পোজিশন জানা যায়।

সক্রেটিস: আর এব্জর্পশন স্পেক্ট্রাম?

জুনো: সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারার আলো যদি কোনো গ্যাসমেঘের ভিতর দিয়ে আমাদের কাছে আসে, তাহলে সেই মেঘ যেই যেই ওয়েভলেন্থে এমিট করত ঠিক সেই সেই ওয়েভলেন্থের আলোই এব্জর্ব করে নেয়। তাই তারার বর্ণালিতে ঠিক সেই সেই ওয়েভলেন্থে আলো পাওয়া যায় না, যা স্পেক্ট্রামের চার্টে দেখতে কালো লাইনের মতো, তাই নাম এব্জর্পশন লাইন। কোন এব্জর্পশন লাইন কোন অণুর জন্য হয় তা ফিজিসিস্টরা ইতিমধ্যে আমাদের জানিয়েছেন। কোনো তারার এব্জর্পশন স্পেক্ট্রামের সাথে ফিজিক্স ল্যাবের স্পেক্ট্রাম মিলালেই বুঝা যায়, কোন লাইনের জন্য কোন অণু দায়ী।

সক্রেটিস: তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু তারার আলো আমাদের কাছে আসার পথে যে গ্যাসমেঘ অতিক্রম করেছে সেটা আসলে কোথায়? আর এর সাথে গ্রহের বায়ুমণ্ডল আবিষ্কারের কি সম্পর্ক?

জুনো: পদ্মার কাছাকাছি যেহেতু চলে এসেছি, বেশি কথা বাড়ায়ো না। আশাকরি ঠিকই আন্দাজ করতে পারছ গ্যাসমেঘটা কোথায়। তবু উপরের ফিগারে দেখাচ্ছি। ট্রানজিটের সময় আমাদের দৃষ্টিরেখায় একটা গ্রহ তার মাতৃতারার সামনে দিয়ে যায়, ফলে তারার আলো কিছুটা কমে। এই আলোর কিছু অংশকে কিন্তু তখন গ্রহের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আমাদের কাছে আসতে হয়। উপরে বলা গ্যাসমেঘ এই বায়ুমণ্ডলেরই। তার মানে তারার স্পেক্ট্রামে আমরা যেসব এব্জর্পশন লাইন পাই তা তৈরিই হয় গ্রহের বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন অণুর মাধ্যমে। তারার বর্ণালি যেন গ্রহের এটমস্ফিয়ারের ফিংগারপ্রিন্ট। এধরনের বর্ণালিকে বলে ট্রান্সমিশন স্পেক্ট্রাম।

সক্রেটিস: অসাধারণ। মনে হয় প্রকৃতি আমাদের কাছে ধরা দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে।

জুনো: আমারো মাঝেমধ্যে তেমন ফিলিং হয়। অনেক গ্রহের বায়ুমণ্ডলই এতদিনে ডিটেক্ট করা গেছে, কিন্তু পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে সব বায়োসিগ্নেচার এখনো পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলে সেই স্পেক্ট্রাম দেখতে কেমন হতো তাই উপরের ফিগারে দেখিয়েছি। এখানে ০.৩ মাইক্রোমিটারের (মাইক্রন) দিকে অক্সিজেন ও ওজোনের লাইন থেকে শুরু করে ইনফ্রারেডে ১৬ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত কার্বন ডায়োক্সাইডের লাইন দেখানো হয়েছে। লাইন এরকম ব্রডই হয়, সরু না। অণুর বেগ এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট ডপলার শিফটের কারণে প্রতিটা এব্জর্পশন লাইন ব্রড হয়ে যায়। পৃথিবীর মতো গ্রহের ট্রান্সমিশন স্পেক্ট্রামে আরো পাওয়া যায় পানি ও মিথেন। এই সবকিছু একসাথে না পেলে কোনো গ্রহে প্রাণের নিশ্চিত প্রমাণ দেয়া সম্ভব না।

bn/courses/ast100/5.txt · Last modified: by asad

Donate Powered by PHP Valid HTML5 Valid CSS Driven by DokuWiki