কৃষি ও ক্যালেন্ডার
আন্টন পানেকুকের ‘আমাদের বিশ্বদর্শনের বিকাশ’ (১৯৫১), অধ্যায় ২
‘আদিম’ অবস্থায় বসবাসকারী অনেক সম্প্রদায় থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ ও ১০০০ সালের মধ্যে চীন, ভারত, মেসোপটেমিয়া ও মিশরের উর্বর সমভূমিতে বড় রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছিল। তারা সংস্কৃতির এক উচ্চতর স্তরের প্রতিনিধিত্ব করত যার লিখিত দলিল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে। পূর্বে স্বাধীন কৃষক সম্প্রদায় ও ছোট শহরগুলি, যাদের নিজস্ব সর্দার ও নগর রাজা, নিজস্ব স্থানীয় দেবতা ও পূজার পদ্ধতি ছিল, তারা একত্রিত হয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক এককে পরিণত হয়েছিল। পলিমাটির অসাধারণ উর্বরতা, যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন করত, তা শাসক এবং কর্মকর্তাদের একটি পৃথক শ্রেণীর জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। এই সংগঠন, প্রথমত, জলের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা থেকে তৈরি হয়েছিল। সমভূমিতে সেচ দেয়া বড় নদীগুলি—নীল, ইউফ্রেটিস, হোয়াং হো—পলি দিয়ে তাদের তলদেশ পূর্ণ করে ফেলত, নির্দিষ্ট মাসে উপচে পড়ে মাঠ প্লাবিত করত, যা কখনও ধ্বংসযজ্ঞ চালাত আবার কখনও বা জমি উর্বর করত, অথবা সময়ে সময়ে নদীর নতুন গতিপথ তৈরি করত। জলকে অবিরত নির্দেশিত করতে হতো এবং বাঁধ দিয়ে, নদী গভীর করে বা খাল খনন করে নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিগত জেলাগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া যেত না কারণ তাদের স্বার্থ অনেক সময়ই ছিল পরস্পরবিরোধী। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল এবং কেবল একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষই নিশ্চিত করতে পারত যে স্থানীয় স্বার্থ সাধারণ স্বার্থের ওপর প্রাধান্য পাবে না। কেবল তখনই উর্বরতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হতো। কিন্তু যখন দেশটি যুদ্ধরত ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ত এবং বাঁধ ও খালগুলি অবহেলিত হতো, তখন মাটি শুকিয়ে যেত বা প্লাবিত হতো এবং মানুষ অনাহারে থাকত, দেশের ওপর ‘দেবতাদের’ রোষ নেমে আসত।
দ্বিতীয়ত, পার্শ্ববর্তী পাহাড় বা মরুভূমির যুদ্ধবাজ বাসিন্দাদের হাত থেকে উর্বর সমভূমিগুলিকে রক্ষা করার জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তির প্রয়োজন ছিল। এই লোকেরা তাদের নিজেদের জমি থেকে যথেষ্ট জীবিকা নির্বাহ করতে পারত না, তাই তাদের সমৃদ্ধ প্রতিবেশীদের কাছ থেকে লুটতরাজ ও জোরপূর্বক কর আদায় করাকে তাদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কাজের একটি বিভাজন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল; যোদ্ধাদের একটি জাত বা বর্ণ গড়ে উঠেছিল যারা তাদের প্রধানকে রাজা হিসেবে মেনে কৃষকদের উদ্বৃত্ত ফসলের নিয়ন্ত্রণকারী শাসক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিল। অথবা এই যাযাবর প্রতিবেশীরা লুটেরা থেকে বিজেতায় পরিণত হয়েছিল এবং কৃষকদের মাঝখানে শাসক অভিজাত হিসেবে বসতি স্থাপন করে তাদেরকে অন্য আগ্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই ফলাফল ছিল একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতা।
এই কাহিনী—যা সময়ে সময়ে পুনরাবৃত্ত হয়েছে—সংক্ষেপে এই দেশগুলোর ইতিহাসের রূপরেখা তুলে ধরে। বারবার ‘বর্বর’ জাতিরা আক্রমণ করে তাদের বশীভূত করেছে, কখনও চীনে মাঞ্চু, ভারতে মোঙ্গল, মিশরে হিক্সোসদের মতো পাতলা উপরের স্তর হিসেবে অবস্থান করেছে, আবার কখনও ভারতে আর্য আর মেসোপটেমিয়ায় সেমিটিকদের মতো সমগ্র জাতি হিসেবে পূর্ববর্তী বাসিন্দাদের সাথে মিশে গেছে বা তাদের প্রতিস্থাপন করেছে। যদিও বিজয়ের ফলে অনেক সংস্কৃতি ধ্বংস হয়েছিল, কিন্তু আক্রমণকারীরা পরে বিদ্যমান উচ্চতর সভ্যতাকে গ্রহণ ও আত্তীকরণ করেছিল এবং প্রায়শই এতে নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার করেছিল। কয়েক প্রজন্ম পরে বন্য শক্তি হারিয়ে বিজেতারা নিজেরাই নতুন আগ্রাসীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছিল।
এই ধরণের সাম্রাজ্যগুলিতে রাজাই ছিলেন আইনপ্রণেতা, প্রধান বিচারপতি, এবং সেই সব সরকারি কর্মকর্তার প্রধান যারা বেসামরিক বিভাগের নেতা হিসেবে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি একটি দ্বিতীয় শাসক শ্রেণী গঠন করেছিল। সাধারণত এটি পুরোহিতদের নিয়ে গঠিত ছিল, যারা স্থানীয় বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা ছিলেন এবং এখন একটি আনুষ্ঠানিক যাজকতন্ত্রে সংগঠিত হয়েছিলেন। পুরোহিততন্ত্র রাষ্ট্র ও সমাজের আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব তাদের হাতে রেখেছিল। উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক ও সাধারণ জ্ঞান তাদের দখলেই ছিল; এটিই ছিল তাদের মর্যাদা এবং সামাজিক ক্ষমতার উৎস। যেখানে কৃষি ছিল প্রধান পেশা, সেখানে পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার এবং ঋতু সম্পর্কিত জ্ঞান ছিল তাদের একচ্ছত্র অধিকার। সেই সময়ে ধর্মও রাষ্ট্র ও সমাজের সাথে একীভূত হয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল; প্রধান শহরগুলির স্থানীয় দেবতাদের একটি উচ্চতর দেবতার অধীনে এক দেবমণ্ডলীতে একত্রিত করা হয়েছিল, যেখানে ছোট বা বিজিত স্থানগুলির স্থানীয় দেবতাদের নিম্ন স্তরের আত্মা হিসেবে অবনমিত করা হয়েছিল বা অন্য দেবতাদের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এইভাবে প্রাচীন ব্যাবিলনে দেবী ইন্নিনা, নিসাবা এবং নানা-কে পরবর্তী ইশ্তারের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল। বোরসিপ্পা দ্রুত বর্ধনশীল শহর ব্যাবিলনের একটি উপশহরে পরিণত হওয়ার ধর্মতাত্ত্বিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন এর নগরদেবতা নাবো মারদুকের পুত্র হিসেবে গণ্য হন। যদিও সংস্কৃতির প্রাচীনতম কেন্দ্র এরিদু উরুক নিপ্পুরের দেবতা ইয়া, আনু ও এনলিলরা (সাধারণত ‘বেল’ অর্থাৎ প্রভু নামে পরিচিত) সব সময় অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় দেবতা হিসেবেই রয়ে গিয়েছিলেন, তবুও খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের পর ব্যাবিলনের রাজনৈতিক আধিপত্য এর স্থানীয় দেবতা মারদুককে দেবমণ্ডলীর প্রধান দেবতা করে তুলেছিল। যখন পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে আসিরিয়া মেসোপটেমীয় বিশ্বের আধিপত্য অর্জন করে, তখন আশুর এই স্থানটি দখল করেন। একটি যাজকতন্ত্রে একত্রিত করা হলে দেবতারা তাদের কিছু স্থানীয় বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেন এবং প্রাকৃতিক শক্তির মূর্ত প্রতীক হিসেবে তাদের চরিত্র আরও প্রকট হয়ে ওঠে। উরের দেবতা সিন ও সিপ্পারার দেবতা শামাশ পরবর্তী সময়ে সব সময় চন্দ্রদেবতা ও সূর্যদেবতা হিসেবে পূজিত হতেন।
একটি গোষ্ঠীর উত্থান, যারা শাসক শ্রেণী হিসেবে আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের জীবন সুরক্ষিত করার প্রয়োজন বোধ করত না, তা অস্তিত্বের এক ‘নয়া বন্দোবস্ত’ তৈরি করল। সামাজিক কাঠামো আরও জটিল হয়ে উঠল, আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের জন্য আরো বেশি যোগ্যতা এবং আরো উন্নত জিনিসের উপর দাবি থাকার প্রয়োজন হলো। ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক চাহিদার জন্ম দিল এবং রাজা ও লর্ডদের হাতে সম্পদ ও বিলাসিতার সাথে এল শিল্প ও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ। এইভাবে পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো নতুন সামাজিক কাঠামোর পাশাপাশি সংস্কৃতির ‘উচ্চতর’ রূপের উদ্ভব হলো যা আদিমকালের সবচেয়ে উন্নত অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেল। তথাকথিত ‘সভ্যতার’ যুগ শুরু হলো।
এই উত্থানের সাথে জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক উচ্চতর বিকাশ জড়িত ছিল। এটি সরাসরি সময় গণনার চাহিদা থেকে এবং আরও বিশেষ করে সৌর বছরের সাথে চন্দ্রপঞ্জিকার সামঞ্জস্য বিধানের সমস্যা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। চাঁদের একটি পর্যায়কাল গড়ে ২৯.৫৩০৫৯ দিন; একটি সৌর বছর হলো ৩৬৫.২৪২২০ দিন, অর্থাৎ ১২টি চন্দ্র পর্যায়কালের চেয়ে ১১ দিন বেশি, যার পরিমাণ ৩৫৪.৩৬৭১ দিন। প্রতি তিন বছরে চন্দ্রপঞ্জিকা সূর্যের গতির চেয়ে ৩৩ দিন পিছিয়ে পড়ে। সূর্যের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য প্রতি তৃতীয় বছরে, কখনও কখনও আরও ঘন ঘন, একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করতে হতো, যাতে বছরে ১২টির পরিবর্তে ১৩টি মাস থাকে। পঞ্জিকার মূল সমস্যাটি ছিল এমন একটি বৃহত্তর সময়কাল খুঁজে বের করা যা মাস এবং বছরের একটি সাধারণ গুণিতক হবে; তাহলে এই সময়কালের পর সূর্য ও চাঁদ আবার একই পারস্পরিক অবস্থানে ফিরে আসবে। অবশ্যই একটি নিখুঁত সাধারণ গুণিতকের অস্তিত্ব নেই, তবে কম-বেশি সন্তোষজনক আসন্ন মান পাওয়া যেতে পারে। সৌর আর চান্দ্র পর্যায়কাল সম্পর্কে আমাদের নিখুঁত আধুনিক জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা তাত্ত্বিকভাবে এই ধরনের আসন্ন ক্যালেন্ডার-পিরিয়ড নির্ণয় করতে পারি। আমরা তাদের অনুপাতকে একটি অবিচ্ছিন্ন ভগ্নাংশে রূপান্তরিত করে এবং এর ধারাবাহিক আসন্ন মানগুলি লিখে কাজটা করি। এইভাবে আমরা ৮/৯৯ এবং ১৯/২৩৫ পাই, যা প্রথমে নির্দেশ করে যে ৮ বছর প্রায় ৯৯ মাসের সমান (যথা ২৯২১.৯৪ এবং ২৯২৩.৫৩ দিন), তাই এই ৮ বছরের মধ্যে ৩টিতে ১৩তম মাস থাকতে হবে এবং ৫টিতে ১২টি মাস থাকতে হবে। তবুও এই আসন্ন মান খুব একটা ভালো নয়; মাত্র ২৪ বছর পরেই চাঁদের তারিখ সৌর ঋতুর সাপেক্ষে ৫ দিন পিছিয়ে পড়বে। অনেক বেশি নিখুঁত হলো ১৯ বছরের একটি সময়কাল যা ২৩৫টি মাস ধারণ করে (৬৯৩৯.৬০ এবং ৬৯৩৯.৬৯ দিন); এখানে ১৩তম মাসটি সাতবার যুক্ত করতে হবে। অবশ্যই প্রাচীনতম সময়ে মানুষের এই সময়কাল সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ছিল না; তাদের জন্য একটি ভালো পঞ্জিকা-সময়কাল খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন ব্যবহারিক সমস্যা, যা শুধুমাত্র সৌর ও চান্দ্র গণনার সামঞ্জস্য বিধানের শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান করা যেত। তাই এই সমস্যাটি মহাকাশের সব ঘটনার আরও সতর্ক পর্যবেক্ষণের জন্য একটি চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এত নির্ভুলতার প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে যেহেতু আবহাওয়ার ওঠানামার কারণে কৃষির কার্যক্রম কিছুটা অনিয়মিত। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে সেই সময়ে কৃষি কার্যক্রম ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবের সাথে যুক্ত ছিল। কৃষি উৎসবগুলি, সমস্ত মহান ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনার মতো, একই সাথে ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠান। প্রভাবশালী প্রাকৃতিক ও সামাজিক শক্তির প্রতিনিধি দেবতারা মানুষের জীবনে অংশ নিতেন; সামাজিকভাবে যা প্রয়োজনীয় বা পর্যাপ্ত ছিল তা দেবতাদের আদেশে পরিণত হতো এবং আচার-অনুষ্ঠানে কঠোরভাবে নির্ধারিত থাকত। প্রকৃতিগতভাবে যা একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে ঘটত, যেমন নবান্ন উৎসব, ধর্মীয় উদযাপন হিসেবে তা একটি নির্দিষ্ট তারিখে নির্ধারিত থাকত, উদাহরণস্বরূপ চাঁদের একটি নির্দিষ্ট কলায়। দেবতাদের সেবা কোনো অসাবধানতার অনুমতি দিত না; সব আচারের সঠিক পালনের দাবি করত। ক্যালেন্ডার ছিল মূলত ধর্মাচারের কালানুক্রমিক বিন্যাস। এটি ক্যালেন্ডারকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে পুরোহিতদের ক্রমাগত যত্নের বস্তুতে পরিণত করেছিল, কিন্তু একই সাথে ‘শুভক্ষণ’ সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের একচেটিয়া অধিকারের কারণে এটি তাদের সামাজিক ক্ষমতার প্রধান উৎস হয়ে উঠেছিল।
ধর্মীয় ও কৃষি সংক্রান্ত অনুশীলন কীভাবে একটি চান্দ্রসৌর পঞ্জিকা প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে গিয়েছিল তার কিছু চমৎকার উদাহরণ আমাদের কাছে এসেছে। ইহুদি ক্যালেন্ডার, মরুভূমিতে এর উৎপত্তি হওয়ার কারণে, চাঁদের ওপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছিল; কিন্তু ইহুদিরা যখন কানান দেশে এসে পৌঁছাল, তখন কৃষি প্রধান পেশা হয়ে উঠল এবং পঞ্জিকাকে সূর্যের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হলো। বসন্তকালে ‘মাসথ’ ছিল একটি ফসল কাটার উৎসব; বার্লির প্রথম আঁটি উৎসর্গ করা হতো এবং প্রথম শস্য থেকে খামিরহীন রুটি তৈরি করা হতো। এই উদযাপন যাযাবরদের ‘পাসাহ-উৎসবের’ সাথে মিশে গিয়েছিল, যা ছিল বসন্তকালে পূর্ণিমায় জেহোভার উদ্দেশ্যে নবজাত মেষশাবক উৎসর্গ করা। তাই এটিকে প্রথম মাস নিসানের পূর্ণিমায় স্থাপন করা হয়েছিল। এটি কীভাবে ঘটেছিল তা আমরা গিনজেলের কালপঞ্জি বিষয়ক বিশাল পাঠ্যবইয়ে পড়ি। “শেষ মাসের শেষের দিকে পুরোহিতরা ক্ষেতের ফসলের অবস্থা পরিদর্শন করতেন এটা দেখার জন্য যে পরবর্তী দুই সপ্তাহে বার্লি পাকার আশা করা যায় কিনা। যদি তারা দেখতেন যে এমনটি হবে, তবে মাসথ-পাসাহ পরবর্তী অমাবস্যা দিয়ে শুরু হওয়া মাসে নির্ধারণ করা হতো; কিন্তু যদি পাকার আশা না করা যেত, তবে উৎসবের মাসটি এক চন্দ্র-পর্যায়কাল পিছিয়ে দেওয়া হতো। এটিই অন্যান্য উৎসবের দিন নির্ধারণ করত।”
এই অভিজ্ঞতালব্ধ পদ্ধতি ইস্রায়েলিদের ততক্ষণ পর্যন্ত সেবা দিতে পারত যতক্ষণ তারা ফিলিস্তিনে একসাথে বসবাস করত। পরে যখন তারা ছড়িয়ে পড়ল, তখন এটি আর ব্যবহার করা যেত না; কিন্তু ততদিনে জ্যোতির্বিজ্ঞান এতদূর অগ্রসর হয়েছিল যে তারা তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পঞ্জিকা-সময়কালের জ্ঞান গ্রহণ করতে পেরেছিল। ১৯ বছরের সময়কাল, যেখানে ১২টি ১২ মাসের বছর এবং ৭টি ১৩ মাসের বছরের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ক্রম ছিল, তা তখন ইহুদি পঞ্জিকার ভিত্তি হয়ে উঠল।
আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় নবী মুহাম্মদের পূর্ববর্তী আরবের ঘটনাবলীতে। পবিত্র মাসগুলিতে রক্তের বদলা নেওয়া স্থগিত রাখা হতো এবং কাফেলা বিপদ ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারত, কারণ অর্থনৈতিক জীবনের জন্য এটি প্রয়োজনীয় ছিল। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে অবিরাম বিবাদ ছিল বেশ স্বাভাবিক, এবং রক্তের বদলা, যা গোত্র সদস্যদের মধ্যে সংহতির একটি আদিম আইনি রূপ, তা প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু এর লাগামহীন প্রবাহ বিপণন এবং খাদ্য সরবরাহ অসম্ভব করে তুলত। মাসুদি বলেন: “সফর মাসটি ইয়েমেনের বাজারের নাম থেকে এর নাম পেয়েছে … এখানে আরবরা তাদের শস্য কিনত, এবং যেই তা করতে ব্যর্থ হতো সেই ক্ষুধায় মারা যেত।” পবিত্র মাসটি ছিল বাজারের মাস; সব দিক থেকে কাফেলা বড় বাজার-শহরগুলিতে ভ্রমণ করত, বিশেষ করে মক্কায়, যা বিখ্যাত ছিল তার অতুলনীয় শীতল কূপ জমজমের জন্য, যা আরবে তীর্থস্থান হিসেবে তার গুরুত্বের উৎস। এখানে গোত্রগুলি মিলিত হতো এবং কথা বলত, এবং এই জমায়েতের স্থানটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র আর রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। তাই এটি অপরিহার্য ছিল যে পবিত্র মাসটি যেন সব সময় বছরের একই সময়ে পড়ে, যখন পণ্য সংগ্রহ করা হয় ও সহজলভ্য থাকে। পরবর্তী একজন মুসলিম পণ্ডিত, আল-বিরুনি, লেখেন: “পৌত্তলিক সময়ে আরবরা তাদের মাসগুলি দিয়ে তাই করত যেমনটি মুসলমানরা এখন করে, এবং তাদের তীর্থযাত্রা বছরের চারটি ঋতুর মধ্য দিয়েই আবর্তিত হতো। কিন্তু তারপর তারা তাদের তীর্থযাত্রাকে এমন একটি সময়ে স্থির করার সিদ্ধান্ত নিল যখন পণ্য চামড়া ফল বিপণনের জন্য প্রস্তুত থাকে; তাই তারা এটিকে অচল বা স্থির করার চেষ্টা করল, যাতে তা সব সময় সবচেয়ে প্রাচুর্যপূর্ণ ঋতুতে থাকে। এজন্য তারা হিজরতের ২০০ বছর আগে ইহুদিদের কাছ থেকে মাস যোজনের (ইন্টারক্যালেশন) পদ্ধতি শিখেছিল। এবং তারা এটি ইহুদিদের মতোই প্রয়োগ করেছিল, তাদের বছর এবং সৌর বছরের মধ্যে পার্থক্য যখন বেড়ে এক মাস হতো তখন তা বছরের মাসগুলির সাথে যুক্ত করে। তখন ‘কালাম্মাসরা’ (একটি নির্দিষ্ট গোত্রের শেখরা, যারা এই কাজের দায়িত্বে ছিল) তীর্থযাত্রার অনুষ্ঠানের শেষে সামনে আসতেন, মানুষের সাথে কথা বলতেন এবং বর্তমান মাসের নামটি পরবর্তী মাসকে দিয়ে একটি মাস যোজন করতেন। লোকেরা করতালির মাধ্যমে কালাম্মাসদের সিদ্ধান্তের অনুমোদন জানাত। এই পদ্ধতিটিকে তারা ‘নাসি’ অর্থাৎ স্থানান্তর বলত, কারণ প্রতি দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছরে বছরের শুরু স্থানান্তরিত হতো। তারা চাঁদের ‘মঞ্জিলের’ উদয় এবং অস্ত থেকে এটি বিচার করতে পারত। মক্কা থেকে মদিনায় নবীর হিজরত পর্যন্ত এটি এভাবেই ছিল।”
হিজরতের পর ৯ম বছরে নবী মুহাম্মদ এই স্থানান্তর নিষিদ্ধ করেছিলেন, সম্ভবত কালাম্মাসদের কাজ কেড়ে নেয়ার মাধ্যমে তাদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ভাঙার জন্য, এবং উপরন্তু নিজেকে ইহুদিদের থেকে আরও স্পষ্টভাবে আলাদা করার জন্য। তাই এখন মুসলিম পঞ্জিকা ৩৫৪ দিনের চান্দ্র বছরের ওপর নির্ভর করে, যার প্রত্যেকটা ১২টি চান্দ্র মাস নিয়ে গঠিত, যা আবার ৩৩ বছরে সমস্ত ঋতুর মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়। এখানে আমরা এমন এক ক্যালেন্ডার পাই যা আনুষ্ঠানিক নির্দেশের মাধ্যমে সামাজিক অনুশীলন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি আদিম বেদুইন জীবনযাত্রার প্রস্তরীভূত ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনা হয়তো একটি উদাহরণ হতে পারে যে কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের ফলস্বরূপ বিভিন্ন জাতির মধ্যে পঞ্জিকা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভিন্ন উপায়ে বিকশিত হয়েছে।




