তারা গ্রহ উপগ্রহ সবারই বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে। আমরা এখানে প্রধানত গ্রহের এটমস্ফিয়ার নিয়ে কথা বলব।
এজন্য প্রথমেই এটমস্ফিয়ারিক প্রেশারের একটা সমীকরণ লাগবে যা হাইড্রোস্টেটিক ইকুইলিব্রিয়াম ব্যবহার করে ডিরাইভ করা সম্ভব। ভূমি থেকে হাইটের ($z$) সাথে প্রেশারের ($P$) সম্পর্ক
$$ \frac{dP}{dz} = -\rho g $$
যেখানে $g$ গ্র্যাভিটেশনাল এক্সিলারেশন আর $\rho$ বাতাসের ঘনত্ব। একটা তারা বা গ্রহের ইন্টেরিয়রের ভারসাম্যও এই একই ধরনের সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। এই ডেন্সিটির সাথে প্রেশারের সম্পর্ক আইডিয়াল গ্যাস ল ব্যবহার করে এইভাবে লেখা যায়:
$$ \frac{P \mu_a m_a}{\rho} = kT $$
যেখানে $k$ বোল্টজমান কন্সটেন্ট, $T$ বাতাসের তাপমাত্রা, $\mu_a$ মিন মলিকুলার ওয়েট (ডাইমেনশনলেস), আর $m_a$ এটমিক ম্যাস ইউনিট। কারণ $PV=NkT$ সমীকরণে $V/N=(M/\rho)/N= (M/N)/\rho = \mu_am_a/\rho$ লেখা যায়, যেখানে $M/N=\mu_a m_a$ বাতাসের একটা কণার গড় ভর, কিলোগ্রাম ইউনিটে। উপরের দুই ইকুয়েশন থেকে পাওয়া যায়
$$ \frac{dP}{dz} = -\frac{P\mu_a m_a g}{kT} $$
যা সল্ভ করার মাধ্যমে হাইটের সাথে প্রেশারের পরিবর্তন জানা সম্ভব। সলুশন সহজে হবে $g$ এবং $T$ কনস্টেন্ট ধরে নিলে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের জন্য এই এজাম্পশন বেশি খারাপ না, কারণ মহাকর্ষত্বরণ আসলেই বেশি পাল্টায় না, আর টেম্পারেচার প্রেশারের তুলনায় অনেক ধীরে পাল্টায়। ভ্যারিয়েবল সেপারেশনের মাধ্যমে উপরের ডিফারেনশাল ইকুয়েশন সল্ভ করা যায় এভাবে:
$$ \int\frac{dP}{P} = -\frac{\mu_a m_ag}{kT} \int dz \Rightarrow \ln P = -\frac{\mu_a m_agz}{kT}+C $$
$$ \Rightarrow P = P_0 e^{-\mu_a m_a gz/(kT)}$$
যেখানে $P_0=e^C$ হলো সিলেভেলে ($z=0$) প্রেশার, আর $C$ ইন্টিগ্রেশনের কনস্টেন্ট। শেষ সমীকরণ থেকে প্রমাণিত হয়, অন্তত পৃথিবীর ক্ষেত্রে ভূমি থেকে উপরের দিকে প্রেশার খুব দ্রুত কমে, কারণ $P\propto e^{-z}$ অর্থাৎ উচ্চতার সাথে চাপের সম্পর্ক এক্সপোনেনশাল।
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মাউনা কিয়া পাহাড়ের উপর কেক অব্জার্ভেটরির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে, ৪ কিমি হাইটের এই চূড়ার উপরে চাপ সিলেভেলে চাপের মাত্র ৬০%; আর এভারেস্টের উপরে, মানে ৯ কিমি উপরে চাপ ভূমিতে চাপের মাত্র ৩০%। মাত্র ৯ কিমি উপরে উঠলেই যদি প্রেশার এত কমে যায়, তাহলে বলতে হবে পৃথিবীর রেডিয়াসের ($R_E$: ৬,০০০ কিমি) তুলনায় তার বায়ুমণ্ডলের পুরুত্ব খুবই কম। এজন্যই $g$ এর মান ধ্রুব ধরে নেয়াটা খারাপ এজাম্পশন ছিল না; মাত্র দশ-বিশ কিমি হাইটের পরিবর্তনের জন্য এই ত্বরণ বেশি পাল্টায় না।
পৃথিবীর এটমস্ফিয়ারের ভর $M$ সহজেই মাপা যায়। সিলেভেলে গোটা বায়ুমণ্ডলের মহাকর্ষ বল $F=Mg$, তাহলে প্রেশার $P_0=F/A=(M/A)g$, এবং তাহলে
$$ M = \frac{P_0A}{g} = \frac{4\pi R_E^2P_0}{g} $$
যার মান হয় আনুমানিক $5\times 10^{18}$ kg মানে পৃথিবীর মোট ভরের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা ও চাপ উপরের দিকে এল্টিচুডের (উচ্চতা) সাথে কিভাবে পাল্টায় তা এই প্লটে দেখানো হয়েছে। চাপ দেয়া আছে মিলিবার ইউনিটে, ১ বার হলো ১ লাখ প্যাস্কেল। গ্রাউন্ড লেভেলে চাপ প্রায় ১ বার, মানে প্রায় ১০০০ মিলিবার। এখানে তাপমাত্রা প্রায় ২৮৮ কেলভিন, যা ট্রপোপজ পর্যন্ত কমতে থাকে। পৃথিবী সূর্যের দৃশ্য আলো শোষণ করে ইনফ্রারেড আলো বিকিরণ করে; সে নিজেই যেহেতু একটা রেডিয়েটিং সোর্স সেহেতু তার সার্ফেস থেকে যত উপরে যাব তাপমাত্রা তত কমবে। ট্রপোস্ফিয়ারে তাপমাত্রা কমার কারণ এটাই। এখানেই সব মেঘ থাকে এবং আমাদের ওয়েদার সিস্টেমও এই অঞ্চলের জিনিস।
ট্রপোপজের পর থেকে তাপমাত্রা আবার বাড়তে থাকে কারণ এখানে, মানে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে আছে আমাদের রক্ষক ওজোন (O$_3$) লেয়ার। দুইটার বদলে তিনটা অক্সিজেন এটমের মলিকুল থাকায় এই লেয়ার সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট আলো শোষণ করে, এতে তার তাপমাত্রা বাড়ে, কিন্তু নিচে আমরা রক্ষা পাই। স্ট্র্যাটোপজ পর্যন্ত এভাবে চলার পরে মেসোস্ফিয়ারে আবার আগের মতো তাপমাত্রা কমতে থাকে কারণ সেখানে ওজোন নাই। প্রায় ৯০ কিমি উপরে মেসোপজ পর্যন্ত টেম্পারেচার কমতেই থাকে, তারপর আবার বাড়ে কারণ থার্মোস্ফিয়ারে বিভিন্ন প্রসেসে সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলকে সরাসরি প্রভাবিত করে। প্লটে এর উপরে আর কিছু দেখানো হয়নি, কিন্তু আরো উপরে প্রায় ৫০০ কিমি হাইতে আছে এক্সোবেজ যেখান থেকে এক্সোস্ফিয়ার শুরু হয়। এক্সোস্ফিয়ারে বাতাসের ঘনত্ব অনেক কম, সেখানের দ্রুতগামী অণুরা বায়ুমণ্ডল থেকে মহাশূন্যে হারিয়ে যেতে থাকে।
আমাদের বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন ৭৮%, অক্সিজেন ২১%, এর পর সবচেয়ে বেশি আছে আর্গন, পানি ও কার্বন ডাই অক্সাইড, তবে সামান্য পরিমাণে। ভিনাসে ৯৭% সিওটু, মার্সে ৯৫% সিওটু। শনির উপগ্রহ টাইটানে ৯০% থেকে ৯৭% নাইট্রোজেন।
নিচের টেবিলে তিনটা ইনার গ্রহ এবং শনির উপগ্রহ টাইটানের বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত বিভিন্ন মৌল ও যৌগের পরিমাণ দেখানো হয়েছে। বুধ নেই, কারণ মার্কারির বলার মতো কোনো বায়ুমণ্ডল নেই। সব পরিমাণ দেয়া আছে পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) ইউনিটে। পৃথিবীতে অক্সিজেন ২,১০,০০০ পিপিএম হওয়ার অর্থ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রতি ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) কণার মধ্যে ২ লাখ ১০ হাজার কণা অক্সিজেনের।
| অণু | পৃথিবী | শুক্র | মঙ্গল | টাইটান |
|---|---|---|---|---|
| নাইট্রোজেন (N₂) | 780000 | 35000 | 27000 | 900000–970000 |
| অক্সিজেন (O₂) | 210000 | 0–20 | ||
| আর্গন (Ar) | 9000 | 70000 | 16000 | 48000 |
| জলীয় বাষ্প (H₂O) | <30000 | 50 | <100 | |
| কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) | 345 | 970000 | 950000 | |
| নিয়ন (Ne) | 18 | 7 | 2.5 | <0.01 |
| ওজোন (O₃) | 10 | |||
| হিলিয়াম (He) | 5 | 12 | ||
| মিথেন (CH₄) | 3 | 50000 | ||
| ক্রিপটন (Kr) | 1 | |||
| কার্বন মনোক্সাইড (CO) | 50 | 700 | 10 | |
| নাইট্রিক অক্সাইড (NO) | 3 | |||
| সালফার ডাই-অক্সাইড (SO₂) | 60 | |||
| হাইড্রোজেন (H₂) | 10 | 0.002 | ||
| অ্যাসিটিলিন (C₂H₂) | 2 | |||
| ইথেন (C₂H₆) | 10 |
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সবচেয়ে বেশি আছে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন, কিন্তু ভিনাস ও মার্সের বায়ুমণ্ডলের প্রধান উপাদান কার্বন ডায়োক্সাইড। প্রাচুর্যের দিক দিয়ে পৃথিবীতে এই কার্বন ডায়োক্সাইডের অবস্থান পঞ্চম। টাইটানে পৃথিবীর মতো অনেক নাইট্রোজেন থাকলেও সেখানে আবার মিথেনের মতো অর্গানিক যৌগও আছে।
আউটার চার গ্রহের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আমরা বেশি জানি না। গ্যালিলিও প্রোব জুপিটারের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই অতি প্রেশারে ভেঙে যায়, ২০০৩ সালে। জায়ান্ট গ্রহদের বায়ুমণ্ডল অনেক পুরু, তাই দূর থেকে ছবি তুলেও খুব বেশি ভিতরের খবর জানা সম্ভব না। তবু রিমোট অব্জার্ভেশনে অনেক কিছু জানা গেছে। অপ্টিকেল ও আল্ট্রাভায়োলেট আলো এদের বায়ুমণ্ডল ভেদ করতে পারে না, তাই ইনফ্রারেড, সাবমিলিমিটার ও রেডিও আলো দিয়ে তুলনামূলক বেশি দেখা সম্ভব। বাইরের চার জায়ান্টের এটমস্ফিয়ারের মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামে তৈরি। তবে মিথেন, পানি, এমোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইডের মেঘ পাওয়া যায়, কারণ সেখানে তাপমাত্রা এতই কম যে এসব গ্যাস জমে যায়; জুপিটার ও স্যাটার্নে এদের পরিমাণ ১ শতাংশের মতো।
ইউরেনাস ও নেপচুনের বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৩ শতাংশ মিথেন, এবং এই গ্যাসের কারণেই এদেরকে নীল দেখায়। উপরে এই দুই গ্রহের দুইটা স্পেক্ট্রাম দেখানো হয়েছে, বাম পাশেরটা হাবল দুরবিনের স্টিস যন্ত্র দিয়ে দেখা, আর ডান পাশেরটা মাউনা কিয়াতে জেমিনাই দুরবিনের এনআইএফএস যন্ত্র দিয়ে দেখা। দেখা যাচ্ছে, ০.৩ থেকে ১.৮ মাইক্রোমিটারের মধ্যে গ্রহ দুইটা সবচেয়ে বেশি রিফ্লেক্ট করে নীল আলো, ০.৬ মাইক্রোমিটারের পর শুরু হয় লাল আলো যার রিফ্লেক্টিভিটি (মানে এলবিডো) দুই গ্রহেরই অনেক কম। এছাড়া ০.৩ থেকে ০.৬ মাইক্রোমিটারের মধ্যে ইউরেনাসের (নীল রেখা) চেয়ে নেপচুনের (লাল রেখা) রিফ্লেক্টিভিটি বেশি।
জায়ান্ট গ্রহদের বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রার ভ্যারিয়েশনও জানা গেছে স্পেক্ট্রোস্কপির মাধ্যমে। কিভাবে তার একটা সরল ব্যাখ্যা এইভাবে দেয়া যায়। ধরা যাক একটা গ্রহের সার্ফেস থেকে কন্টিনুয়াম রেডিয়েশন আসছে, মানে একটা রেঞ্জের মধ্যে সব ফ্রিকোয়েন্সিতে আলো পাওয়া যাচ্ছে, আর সার্ফেস থেকে উপরে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন লেয়ার থেকে আসছে লাইন রেডিয়েশন, মানে নির্দিষ্ট কিছু কম্পাঙ্কে এব্জর্পশন বা এমিশন লাইন। নিচের লেয়ারের চেয়ে উপরের লেয়ার যদি ঠাণ্ডা হয় তাহলে উপরের লেয়ারে এব্জর্পশন হবে, উল্টোটা হলে হবে এমিশন। পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে, জায়ান্ট গ্রহদের বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা সার্ফেস থেকে উপরের দিকে কমে, এবং এই কমার হার পৃথিবীর ট্রপোস্ফিয়ারে এডায়াবেটিক গ্রেডিয়েন্টের (মেঘ দ্রষ্টব্য) মতো।
টাইটান একমাত্র মুন যার উল্লেখযোগ্য বায়ুমণ্ডল আছে। পৃথিবীতে পানি যেমন কঠিন তরল বায়বীয় তিন অবস্থাতেই থাকতে পারে, তেমনি টাইটানে মিথেন এই তিন অবস্থাতেই থাকতে পারে। তার মানে টাইটানে মিথেনের হ্রদ ও বরফ আছে, এবং টাইটানের আকাশ থেকে মিথেনের বৃষ্টি ও তুষার পড়ে। টাইটানের সার্ফেসে পাঠানো হাইগেন্স প্রোব দেখেছে, সার্ফেস থেকে মিথেনের বাষ্প উঠছে, তার মানে পৃথিবীর পানিচক্রের মতো টাইটানে আছে একটা মিথেনচক্র।
তবে টাইটানের সার্ফেসের ভালো মানচিত্র বানানো সম্ভব হয়েছে তাকে অর্বিট করতে থাকা ক্যাসিনি স্যাটেলাইটের রেডারের মাধ্যমে। ক্যাসিনির ট্রান্সমিটার টাইটানের সার্ফেসে রেডিও ওয়েভ পাঠিয়েছে, সার্ফেস তার কিছু অংশ রিফ্লেক্ট করেছে, এবং ক্যাসিনির রিসিভার তা এনালাইজ করে সার্ফেসের মানচিত্র বানিয়েছে। এই রকম এস্ট্রোজিওলজির মাধ্যমে বর্তমানে আমরা টাইটানের একটা জিওলজিকেল মানচিত্র বানাতে পেরেছি, যা উপরে দেয়া হয়েছে। ক্যাসিনি টাইটানের সার্ফেসে সত্তরের বেশি এমন জায়গা পেয়েছিল যেখান থেকে রেডিও তরঙ্গের ভালো রিফ্লেকশন হচ্ছে না, ঠিক পৃথিবীর সমুদ্র বা হ্রদের মতো। মিথেনের (ও ইথেন) এসব স্টোরেজের সাইজ ৩ থেকে ৭০ কিমি পর্যন্ত এবং অবস্থান মেরুর দিকে, বিশেষ করে উত্তর মেরু অঞ্চলে। সোলার সিস্টেমের অন্য সব জায়গার মতো এখানেও হ্রদের নাম লাকুস, আর সাগরের নাম মারে রাখা হয়েছে। ছবিতে উত্তর মেরুর ক্রাকেন মারে, আর দক্ষিণ মেরুর অন্টারিও লাকুস দেখা যাচ্ছে নীল রঙে।
ইনার চার গ্রহের বায়ুমণ্ডল প্রাইমারি না, সেকেন্ডারি। একটা গ্রহের জন্মের প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই যদি বায়ুমণ্ডল তৈরি হয় তবে তাকে প্রাইমারি বায়ুমণ্ডল বলে, আর জন্মের পরে অন্য প্রক্রিয়ায় হলে সেকেন্ডারি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যে প্রাইমারি না তার একটা বড় প্রমাণ হলো, প্রাইমারি হলে তার মধ্যে বিভিন্ন মৌলের প্রাচুর্য আদিম সোলার নেবুলার মতো এবং সেই হিসেবে বর্তমান সোলার সিস্টেমের সব জায়গার মতোই হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু বাস্তবে আমাদের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন মৌলের অনুপাত সৌরজগতের গড় অবস্থা থেকে অনেক আলাদা। সৌরজগতে এবান্ডেন্স সবচেয়ে বেশি হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের, কিন্তু আমাদের বায়ুমণ্ডলে সবচেয়ে বেশি নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের।
তবু প্রাইমারি এটমস্ফিয়ার সমর্থন করে কেউ বলতে পারেন, শুরুতে আমাদের বায়ুমণ্ডলেও অনেক হাইড্রোজেন হিলিয়াম ছিল, কিন্তু এরা সবচেয়ে হালকা হওয়ায় এবং আমাদের গ্রহের ভর খুব বেশি না হওয়ায় পৃথিবীর মহাকর্ষ তাদেরকে ধরে রাখতে পারেনি, তারা ইন্টারপ্ল্যানেটারি স্পেসে মিলিয়ে গেছে। এই যুক্তিতে বাদ সাধে নিয়ন। সৌরজগতে প্রাচুর্যের দিক দিয়ে নিয়নের অবস্থান পাঁচে, কিন্তু ইনার চার গ্রহের কোনটাতেই বেশি নিয়ন নাই। আবার নিয়ন অত হালকাও না যে এসব গ্রহের মহাকর্ষ তাদের ধরে রাখতে পারবে না। ভিনাস আর্থ মার্সের বায়ুমণ্ডল যদি প্রাইমারিই হয় তাহলে সব নিয়ন কোথায় গেল? অন্য মৌলের সাথে বিক্রিয়া করে মাটিতে মিশেও যেতে পারবে না কারণ নিয়ন একটা নিষ্ক্রিয় গ্যাস। সুতরাং একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে এই, আমাদের বায়ুমণ্ডল প্রাইমারি না, সেকেন্ডারি।
তার মানে তিনটা রকি প্ল্যানেটের এটমস্ফিয়ার গঠিত হয়েছে দুইটা সেকেন্ডারি প্রক্রিয়ায়: তাদের ইন্টেরিয়র থেকে গ্যাস লিক করে বাইরে আসার মাধ্যমে, এবং জন্মের পরে তার সাথে কোনো বরফ-সমৃদ্ধ প্ল্যানেটেসিমালের সংঘর্ষের মাধ্যমে। অনেক প্ল্যানেটেসিমাল জোড়া লেগেই গ্রহের জন্ম হয়, যাদের মধ্যে অনেক পাথর ও বরফ আগে থেকেই ছিল। সুতরাং বায়ুমণ্ডল বানানোর উপকরণ গ্রহের জন্মের সময়ই গ্রহের ভিতরে ছিল বলা যায়। ভল্কানো থেকে এখনো যেভাবে গ্যাস বের হয় সেই একই প্রক্রিয়ায় সম্ভবত জন্মের পর পর পৃথিবীর ভিতর থেকে অনেক গ্যাস বের হয়ে তার বায়ুমণ্ডল তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়া অনেক ধীর। এর বিপরীতে অন্য কোনো আইস-রিচ প্ল্যানেটেসিমালের কলিশন থেকে অনেক দ্রুতও বায়ুমণ্ডলের জন্ম হতে পারে।
বায়ুমণ্ডল হতে পারে রিডিউসিং (মানে হাইড্রোজেনভিত্তিক) অথবা অক্সিডাইজিং (হাইড্রোজেনবিহীন)। রিডিউসিং বাতাসে অনেক মিথেন, এমোনিয়া, পানি, ও হাইড্রোজেন সালফাইড থাকে। আর অক্সিডাইজিং বাতাসে থাকে কার্বন ডায়োক্সাইড, নাইট্রোজেন, ও সালফার ডায়োক্সাইড। বর্তমানে রকি গ্রহের বায়ুমণ্ডল বেশি অক্সিডাইজিং, কিন্তু শুরুতেও তাই ছিল কি না বলা মুশকিল। তবে সার্বিকভাবে একটা কথা সত্য, বায়ুমণ্ডল থাকতে হলে ভর বেশি হতে হয় যা বাতাসের সব কণার জন্য ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজমান ডিস্ট্রিবিউশনের সমীকরণ লিখলে বুঝা সম্ভব।
$$ p(>v_{\text{esc}}) = \int_{v_{\text{esc}}}^{\infty} N \left( \frac{2}{\pi} \right)^{\frac{1}{2}} \left( \frac{m}{kT} \right)^{\frac{3}{2}} v^2 e^{-\frac{mv^2}{2kT}} \, dv $$
এখানে ডিস্ট্রিবিউশনের লেজের অংশটা দেখানো হয়েছে, তার মানে $p(> v_{esc})$ হলো সেই সব কণার ফ্র্যাকশন যাদের বেগ গ্রহের মুক্তিবেগের চেয়ে বেশি, যাদেরকে গ্রহটা গ্র্যাভিটির মাধ্যমে ধরে রাখতে পারবে না। এখানে $N$ গ্যাসের কণার নাম্বার ডেন্সিটি, $m$ প্রতিটা কণার ভর। সমীকরণ বলছে, কণার ভর বাড়লে বা অব্জেক্টের এস্কেপ ভেলোসিটি বাড়লে, তুলনামূলক কম কণা পালাতে পারে। হাইড্রোজেনের ভর অনেক কম বলে রকি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে থেকে বেশি পালিয়েছে, তাই তাদের বায়ুমণ্ডল আগে বেশি রিডিউসিং হয়ে থাকলেও এখন বেশি অক্সিডাইজিং। আবার যে অব্জেক্টের ভর বেশি তা থেকে পালানোর জন্য প্রয়োজনীয় মুক্তিবেগও বেশি। এই কারণে ছোট গ্রহ বা উপগ্রহের বায়ুমণ্ডল ধরে রাখার ক্ষমতা কম।
পৃথিবীতে অনেক পানি থাকলেও ভিনাসে নেই বললেই চলে। হয়ত ভিনাসের জন্মই হয়েছে এমন সব প্ল্যানেটেসিমাল দিয়ে যাদের ভিতরে বেশি পানি ছিল না। অথবা এমনও হতে পারে যে শুরুতে ভিনাসের বায়ুমণ্ডলে অনেক পানি ছিল, কিন্তু সূর্যের বেশি কাছে হওয়ায় আল্ট্রাভায়োলেট আলো তার পানিকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে রূপান্তরিত করেছে, এবং তার মধ্যে হাইড্রোজেন হালকা হওয়ায় পালিয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ার নাম ফটোডিসোসিয়েশন। এছাড়া বায়ুমণ্ডল থেকে বাতাস হারিয়ে যাওয়ার আরো অনেক প্রক্রিয়া আছে। অবশ্য মার্সের বায়ুমণ্ডল হারিয়ে যাচ্ছে প্রধানত তার ভর অনেক কম হওয়ার কারণে।
তবে বায়ুমণ্ডল থেকে একটা অণু সৌরজগতে হারিয়ে না গিয়ে গ্রহের ভিতরেও ঢুকে যেতে পারে, যার ভালো উদাহরণ পৃথিবীর কার্বনেট-সিলিকেট সাইকেল। এই সাইকেলের মাধ্যমে এটমস্ফিয়ার থেকে কার্বন ডায়োক্সাইড সার্ফেসে জমা হয় এবং তার পর আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। প্রথমে কার্বন ডায়োক্সাইড বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মাটিতে আসে, রকে সিলিকেটের সাথে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম ও কার্বনেট আয়ন তৈরি করে, এসব নদীর পানিতে মিশে সমুদ্রে পড়ে, সমুদ্রে বিভিন্ন প্রাণী এদের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম কার্বনেট শেল বানায়, মৃত্যুর পর এসব শেল সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়। এভাবে জমা হওয়া কার্বন ডায়োক্সাইড আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে আনে টেক্টোনিক এক্টিভিটি। ওশানিক ক্রাস্ট সাবডাকশনের কারণে পৃথিবীর ম্যান্টলে চলে যায়, সেখানে অনেক তাপের কারণে গলে যায়, কার্বনেট সিলিকেটের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন ডায়োক্সাইড বানায় যা ভল্কানোর ইরাপশনের সময় পৃথিবীর ভিতর থেকে বেরিয়ে আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। এই সাইকেলের কারণেই বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডায়োক্সাইডের পরিমাণ ও সেই কারণে তাপমাত্রা গত সাড়ে চার বিলিয়ন বছরে গড়ে সমান ছিল, যদিও এই সময়ের মধ্যে সূর্যের উজ্জ্বলতা ৩০% বেড়েছে।